
২০২১ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের বছর। এই বছরেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করে জাতি। এই বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষ ঘিরে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানায়, যারা মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে ছিল অথবা বর্তমানে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অংশীদার। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন। এই সফর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হলেও দেশের একাংশ বিশেষ করে ইসলামপন্থী দলগুলো এই সফরের প্রবল বিরোধিতা করে এবং রাস্তায় নেমে আন্দোলন গড়ে তোলে।
মোদির সফরকে ঘিরে যে বিরোধিতা তৈরি হয়, তা শুধু ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক নয়, বরং ধর্মীয় আবেগ ও সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, নরেন্দ্র মোদি একজন ইসলামবিদ্বেষী নেতা যিনি ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন। তারা গুজরাট দাঙ্গা, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (ঈঅঅ), ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (ঘজঈ)-এর মতো বিষয় তুলে ধরে মোদির সফরের বিরোধিতা করে। এসব দাবি ও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জামায়াতে ইসলামী। তারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।
জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বের দাবি রাখে। দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করেছিল এবং স্বাধীনতা বিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের অনেক নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয় ও শাস্তি কার্যকর হয়। জামায়াত বর্তমানে নিষিদ্ধ না হলেও রাজনৈতিকভাবে অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। এমতাবস্থায় মোদির সফরকে তারা একটি নতুন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করে। জামায়াত সরাসরি আন্দোলনে নামেনি, তবে তাদের আদর্শিক মিত্র সংগঠন, মাদ্রাসাভিত্তিক ছাত্র সংগঠন এবং ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে তারা জনগণকে উসকে দেয়। এই আন্দোলন মূলত ঢাকা থেকে শুরু হলেও পরে ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। রেলস্টেশন, সরকারি দপ্তর, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়।
এই সহিংসতা শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল না; বরং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। জামায়াতে ইসলামী তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে এবং সরকারকে চাপে ফেলতে এই আন্দোলনের পেছনে থেকে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। তাদের কৌশল ছিল ধর্মীয় আবেগকে উসকে দেওয়া, ভারত-বিরোধিতাকে ব্যবহার করে জনগণের মনোভাব প্রভাবিত করা এবং সরকারের বিরুদ্ধাচরণকে একটি ‘ইসলামপন্থী সংগ্রাম’ হিসেবে তুলে ধরা।
সরকার এই পরিস্থিতিকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালায়, সহিংসতায় জড়িতদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করে এবং সরকার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে বিরোধিতা করতে গিয়ে কেউ যদি সহিংসতা সৃষ্টি করে, তাহলে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র; কাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে, তা বাংলাদেশের সরকারই নির্ধারণ করবে।
এই আন্দোলন ও সহিংসতা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচিত হয়। বিবিসি, আল-জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই পরিস্থিতির খবর প্রকাশ করে। বিদেশি বিশ্লেষকরাও লক্ষ্য করেন, জামায়াত ও তাদের মিত্র সংগঠনগুলো কীভাবে একটি ধর্মীয় লেবাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটিয়েছে। এই সহিংসতার মাধ্যমে তারা শুধু সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চায়নি, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং স্থিতিশীলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে চেয়েছে।
মোদির সফর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতিনিধির আগমন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ও তার মিত্রদের ধর্মীয় উসকানি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আন্দোলনের মাধ্যমে দেশব্যাপী যে সহিংসতা ঘটেছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাদের এই ধরনের কার্যকলাপ প্রমাণ করে যে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী এই শক্তি এখনো বিভিন্ন মোড়কে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
অতএব, এ ধরনের উগ্র ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সক্রিয় রাখা এবং গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও সংবিধানকে রক্ষা করা সকল দেশপ্রেমিক নাগরিকের কর্তব্য। একমাত্র গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য এবং ইতিহাসের শিক্ষা থেকেই আমরা বুঝতে পারি, স্বাধীনতাবিরোধী কোনো অপশক্তিই কখনো দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে পারবে না।
লেখক :
আহবায়ক : বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
জাউয়াবাজার ইউনিয়ন শাখা, ছাতক, সুনামগঞ্জ।