
দিরাই প্রতিনিধি ::: সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কালিপূজায় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। উক্ত হামলায় মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুরের পাশাপাশি একজন নিহত হয়েছেন। অন্তত ১২-১৫ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী গুরুতরভাবে আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
রবিবার (১২ নভেম্বর) আনুমানিক রাত ১০টার দিকে দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের মাহাতাবুর গ্রামে লোকেশ চন্দ্র দাসের বাড়ির কালী মন্দিরে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
নিহত ব্যক্তি হলেন- মাহাতাবপুর গ্রামের রমাকান্ত দাসের ছেলে শ্রীকান্ত দাস (৪০)।
আহতরা হলেন- লোকেশ চন্দ্র দাসের ছেলে অনিক দাস (২৫), অনিক দাসের স্ত্রী ঈশিতা চক্রবর্তী (২৫), সন্তোষ কুমার দাস (৫০), সন্তোষ কুমার দাসের স্ত্রী কৃষ্ণা রানী দাস (৪৬), মন্টু দাস (৩৫), নিকট চন্দ্র হাওলাদার (১৭), ভিবাস চন্দ্র হাওলাদার (২৭), তার স্ত্রী ঝুমুর রানী (২৫), সুবর্না রানী (১৫), অন্তরা রানী (১৭), সজল দাস (৩৭), দিবাংসু দাস (২৪), স্বপন দাস (৪৮)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল রবিবার (১২ নভেম্বর) দীপাবলি উপলক্ষে দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের মাহাতাবপুর গ্রামে লোকেশ চন্দ্র দাসের বাড়িতে পারিবারিক উদ্যোগে ও গ্রামের সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কালী পূজার আয়োজন করা হয়। প্রায় ২০-২৫ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী পূজার উদ্দেশ্যে কালী মন্দির প্রাঙ্গণে সম্মিলিত হয়। কিন্তু পূজা চলাকালীন সময় আনুমানিক রাত ১০টার দিকে হঠাৎ একদল সন্ত্রাসী মন্দির প্রাঙ্গণে ঢুকে আক্রমণ চালায়। বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামি দিরাই পৌর শাখার সভাপতি (এহসান চৌধুরী), জামায়েত ইসলামির দিরাই পৌর শাখার সাধারণ সম্পাদক (আব্দুল ওয়াব), জামায়েত ইসলামির সদস্য ও এহসান চৌধুরীর ছোট ভাই (এনামুল চৌধুরী) এবং আব্দুল ওয়াবের ভাতিজা (আব্দুল মতিনের) নেতৃত্বে প্রায় ৪০-৫০ জন স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও উগ্রবাদী মুসলিম জনতা পূজায় উপস্থিত হিন্দুদের উপর অর্তকীত হামলা চালায়। এসময় তাদের হাতে থাকা দেশীয় অস্ত্র (রামদা, পাইপ, লাঠি, লোহার রড, বল্লম, কুচার শলা, ছুরি) নিয়ে পূজায় উপস্থিত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপর নৃশংস হামলা চালানো হয়। অতঃপর আক্রমণকারীরা মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করে ভিতরে থাকা কালী প্রতিমা ও মন্দিরের দেওয়াল ভেঙ্গে ফেলে এবং মূর্তির গায়ে থাকা গহনা লুট করে নিয়ে যায়। উক্ত সন্ত্রাসীরা পূজাতে উপস্থিত নারী ও শিশুদের উপরেও ব্যাপক হামলা চালায়। পূজায় উপস্থিত সনাতন ধর্মালম্বীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা প্রাণ বাঁচানোর জন্য এদিক ওদিক পলায়ন করে। সেই সময় মাহাতাবপুর গ্রামের লোকেশ চন্দ্র দাসের ছেলে অনিক দাস ও রমাকান্ত দাসের ছেলে শ্রীকান্ত দাসসহ কয়েকজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী সন্ত্রাসীদের বাঁধা প্রদানের চেষ্টা করলে হামলাকারীরা তাদেরকে গুরুতরভাবে আহত করে। এসময় এহসান চৌধুরীর ছোট ভাই এনামুল চৌধুরী ও আব্দুল ওয়াবের ভাতিজা আব্দুল মতিনসহ হামলাকারীরা লাঠি দিয়ে অনিক দাসের মাথায় আঘাত করে এবং সেই সময় স্বামীকে রক্ষা করতে অনিক দাসের স্ত্রী ঈশিতা চক্রবর্তী এগিয়ে এলে হামলাকারীরা ঈশিতা চক্রবর্তীকে রড দিয়ে তার পায়ে আঘাত করে। এক পর্যায়ে শ্রীকান্ত দাস তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসলে সন্ত্রাসীরা তাকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। ফলে শ্রীকান্ত দাস ঘটনা স্থলেই মারা যান। সেই সাথে অনিক দাস, তার স্ত্রী ঈশিতা চক্রবর্তীসহ প্রায় (১২-১৫) জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে এলাকাবাসীর সহায়তায় তাদেরকে স্থানীয় দিরাই সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
আহত অনিক দাস বলেন, “দীপাবলি উপলক্ষে আমাদের বাড়িতে পারিবারিক উদ্যোগে ও গ্রামের সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রচেষ্টায় কালী পূজার আয়োজন করি। এসময় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে দিরাই সরমঙ্গল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এহসান চৌধুরী, মাহাতাবুর জামেয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল আব্দুল ওয়াব, এহসান চৌধুরীর ছোট ভাই এনামুল চৌধুরী এবং আব্দুল ওয়াবের ভাতিজা আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে প্রায় (৪০-৫০) জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও স্থানীয় উগ্রবাদী তৌহিদী জনতা আমাদের মন্দির প্রাঙনে ঢোকে আমাদের উপর প্রাণঘাতি হামলা করে। এই হামলায় আমার কাকা শ্রীকান্ত দাস নিহত হন এবং আমি ও আমার স্ত্রীসহ প্রায় ১০-১৫ জন হিন্দু ধর্মালম্বী নারী-পুরুষ গুরুতরভাবে আহত হই।”
তিনি বলেন, “হামলা চলাকালীন মন্দিরের কালী প্রতিমা ও দেওয়াল ভাঙচুর করা হয় এবং মূর্তির গায়ে থাকা মূল্যবান গহনা লুট করা হয়। সেই সময় তাদেরকে বাধা দিতে গেলে সন্ত্রাসীরা লাঠি দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করে ও আমার স্ত্রীর উপর আক্রমণ করে। এক পর্যায়ে আমার কাকা শ্রীকান্ত দাস আমাদেরকে বাঁচাতে এগিয়ে আসলে সন্ত্রাসীরা তাকে ধারালো রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে এবং অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের দরুন তিনি ঘটনা স্থলেই মৃত্যু বরণ করেন।”
তিনি আরও বলেন, “এহসান চৌধুরী ও আব্দুল ওয়াব দীর্ঘদিন যাবৎ আমাদের কালী মন্দির ও তার আশেপাশের জায়গাটি দখলের জন্য ষড়যন্ত্র করে আসছিলেন। যার দরুন আমরা সংখ্যালঘুরা প্রতিনিয়ত তাদের দ্বারা বিভিন্নভাবে ভয়, ভীতি ও হুমকির শিকার হচ্ছি। তাই আমি এলাকার অন্যান্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে তাদের এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি যার কারণে উগ্রবাদিরা আমাদের উপর ক্ষীপ্ত হয়ে বর্বোরোচিত আক্রমণ চালায়।”
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দিরাই থানার অফিসার ইনচার্য রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাহাতাবুর গ্রামে সন্ত্রাসী হামলার খবর পাওয়ামাত্রই আমাদের পুলিশ ফোর্সের সদস্যরা সেখানে পৌছেছে। এ ঘটনায় শ্রীকান্ত দাস নামে একজন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আমরা লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছি। খুব শ্রীঘ্রই আমরা আসামিদের গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’
সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি : নূরুর রশীদ চৌধুরী, সম্পাদক : ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক : ফাহমীনা নাহাস
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : অপূর্ব শর্মা