
চুরি উপমহাদেশে অতি সুপ্রাচীন পেশা। ইহার কারণ, সম্ভবত এইখানে চুরির ‘সুযোগ’ অধিক এবং সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করিয়াই এই অঞ্চলে চুরি পেশাকে রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে নিয়া গিয়াছে। ফ্রান্সিস বেকন বলিয়াছেন, ‘একটি চোরকে পরিপূর্ণ করিয়া তোলে শুধু একটি ভালো সুযোগ।’ অর্থাৎ, সুযোগ পাইলেই চোর মহাশয় চুরি করিবার ব্যাপারে দুই বার ভাবিবার অবকাশ রাখেন না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আমরা ঠিক সেই অবস্থাই প্রত্যক্ষ করিতেছি।
gnews দৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
চলমান ক্রান্তিকালে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়াছে। আর সেই সুযোগে চোর-ডাকাতের উপদ্রব বৃদ্ধির ফলে চুরি-ডাকাতির বহু ঘটনা ঘটিতেছে। এই চোরের দল কেবল গেরস্তের গোয়াল হইতে গবাদি পশু চুরি করিয়াই ক্ষান্ত হইতেছে না, উপরন্তু পুকুরের মাছ, ধান-গম বা নির্মাণসামগ্রী, দোকানপসার-খেতখামার-ব্যবসায়বাণিজ্য এমনকি পশুপাখিও ধরিয়া ফেলিয়াছে। গণমাধ্যমের খবর হইতে জানা যায়, বিগত ১১ মাসে ৭ হাজার পোষা প্রাণী চুরির অভিযোগ পাইয়াছে পুলিশ। এই কাজ তাহারা করিতেছে রীতিমতো সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব ও যত্ন সহকারে। কেবল ট্রাকে করিয়া নহে, গবাদি পশু চুরির কাজে ব্যবহৃত হইতেছে প্রাইভেট কারও। এই ধরনের একাধিক দৃশ্য দেশবাসী প্রত্যক্ষ করিয়াছে। চোর রাতে বাড়ির ঘরের দরজায় তালা বা শিকল দিয়া গবাদি পশু চুরি করিয়া লইতেছে। খামারে রাখালকে বাঁধিয়া রাখিয়া ডাকাতি চলিতেছে। শুধু চুরি-ডাকাতি হইলে কথা ছিল, ইহাতে বহু হতাহতের ঘটনাও ঘটিতেছে। বিশেষত দুর্গম, সুনসান চরাঞ্চল ও বিল এলাকায় এই প্রবণতা অধিক।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক তথ্যে জানা যায়, চলতি বৎসর জানুয়ারি মাসে ৭৯৭টি চুরির মামলা রেকর্ড করা হয়। ইহার পর ফেব্রুয়ারি মাসে ৬৭৩টি, মার্চ মাসে ৮৬৬টি, এপ্রিল মাসে ৭১৫টি, মে মাসে ৭৬৫টি এবং জুন মাসে ৭২২টি মামলা দায়ের করা হইয়াছে। ২০২৪ সালের আগস্টে, তথা সরকার পরিবর্তনের মাসটিতে চুরির মামলা ছিল ৩৮১টি। তবে পরবর্তী সময়ে চুরির উল্লম্ফন ঘটিতে থাকে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো সক্রিয় করার কোনো বিকল্প নাই। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘সাধ্যমতো’ কাজ করিতেছে। আবার তাহাদের পক্ষ হইতেই ‘বক্তব্য’ আছে! পুলিশ পূর্বের ন্যায় মাঠে কাজ করিতে পারিতেছে না বলিয়াই প্রতীয়মান। মূলত এই সুযোগকেই কাজে লাগাইতেছে দুষ্কৃতকারীরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উত্তরণে সেনাবাহিনীর তৎপরতা রহিয়াছে। তবে সার্বিক পরিবেশ যেইরূপ বিরূপ হইয়া উঠিয়াছে, তাহাতে সেনাবাহিনীর একার পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশে অস্থিরতা থাকিবে, বিশৃঙ্খলা হইবে-ইহা হয়তো স্বাভাবিক, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা একটু বেশিই কর্কশ! এমন সকল ঘটনাও ঘটিতে দেখা যাইতেছে, যাহা কিছুদিন পূর্বেও কল্পনার বাহিরে ছিল। দেশ হইতে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি পর্যন্ত বন্ধ হইয়া গিয়াছিল, সর্বস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অবাধ বিচরণ ছিল। তবে সেই দিন যেন আজ আর নাই! বরং তাহাদের বিচরণস্থল এখন দুষ্কৃতকারীদের কবজায়। পুলিশের সামনেই চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির বহু ঘটনা ঘটিয়া যাইতেছে। অথচ তাহারা নির্বিকার ‘দায়িত্বরত’। যেন নিষ্ক্রিয় দর্শক-তাহাদের কিছুই করিবার নাই! এই সংস্কৃতি বন্ধ করিতে না পারিলে সমাজজীবন এক পা-ও সামনে অগ্রসর হইতে পারিবে না। মানুষ ভয়ভীতিমুক্ত যেই পরিবেশ প্রত্যাশা করে, তাহার বালাই থাকিবে না।
সুতরাং, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিতে হইবে। অতীত কিংবা বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে পুলিশের কোনো বিকল্প থাকিতে পারে না। তাহাদেরকে সার্বিক সহযোগিতা দিতে হইবে। সর্বোপরি, সমাজ হইতে ভয় দূর করিতে হইবে। কারণ, মানুষ এখন প্রতিবাদ করিতেও ডর পাইতেছে। এই ভয়ডর দূর করা গেলে চুরি-ডাকাতির সুযোগ কমিয়া আসিবে এবং মানুষ তখন অধিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধমুখী হইবে। সুষ্ঠু সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিতে ইহা আজিকার দিনে অনেক বেশি জরুরি।