
উন্নয়নশীল দেশসমূহে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কথার সহিত কাজের মিল খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। মুখে বলা হয় সেই দেশের নাগরিকরা মুক্ত ও স্বাধীন; কিন্তু আসলে কি তাহারা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক? গণতন্ত্রের অন্যতম পূর্বশর্ত হইল, একটি ভয়ভীতিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা; কিন্তু অযৌক্তিক কারণেও এই সকল দেশে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিতে দেখা যায়। ইহার জন্য কাহারো কাহারো সম্মুখে নামিয়া আসে নানা খড়ুগ বা বাধা-প্রতিবন্ধকতা। এমনকি এই জন্য ফ্রি মুভমেন্ট বা মুক্তভাবে চলাফিরা করিবার স্বাধীনতাও ব্যাহত হয়। এই বাধাটা সমাজের যেইখান হইতে আসে, তাহাদের সংখ্যা বলিতে গেলে খুবই সীমিত। সাধারণত একটি দেশের কোটি কোটি মানুষের মধ্যে অধিকাংশ লোকই নিরীহ। তাহারা পাওয়ার পলিটিকস বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির চর্চা করেন না; কিন্তু কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ মানুষের নিত্যদিনের খেলার পুতুলে পরিণত হন তাহারা। তাহাদের অঙ্গুলিহেলনে তাহারা তখন চুপসাইয়া যান। তাহাদের কারণে সমাজের সর্বত্র বিরাজ করে এক ভয়ভীতিকর পরিবেশ। গণমাধ্যম তখন বাস্তবতা বুঝিতে পারিয়া সেল্ফ সেন্সরশিপে চলিয়া যায়।
gnews দৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ নেতার মধ্যেও সহিষ্ণুতা ও সহনশীলতার অভাব বিদ্যমান। উদার গণতান্ত্রিক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশের অভাবে সেই দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সকল সময় তটস্থ থাকে। নামকাওয়াস্তে বা মুখরক্ষার খাতিরে মুক্তসমাজ, মুক্তগণমাধ্যম ইত্যাদির কথা বলা হইলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমালোচনা সহ্য করা হয় না। তাহারা মুখে চিন্তা করিয়া বলিবার কথা বলেন বটে; কিন্তু চিন্তা করিয়া বলিতে গেলেও রিঅ্যাক্ট বা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ঠিকই। অথচ সেই বক্তব্য যৌক্তিক কি না, তাহা সাধারণ মানুষের বিবেচনার উপর ছাড়িয়া দেওয়া উচিত। সাধারণ মানুষকে কিছু সময়ের জন্য দমাইয়া রাখা যায়; কিন্তু সকল সময়ের জন্য নহে। এমন একসময় আসে, যখন তাহাদের ভয় কাটিয়া যায়। তাহাদের তখন হারাইবার আর কিছুই থাকে না। তখন এই সকল দেশে সৃষ্টি হয় নৈরাজ্য ও অস্থিরতা। উন্নয়নশীল বিশ্বে এমনিতেই তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থান তৈরির জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ লওয়া হয় না। মানুষের মৌলিক অনেক অধিকার পূরণ করা যায় না। ফলে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা তৈরি এবং বিস্ফোরণের জন্য এই সকল দেশ যেন সকল সময় উন্মুখ হইয়া থাকে। এই পরিস্থিতিতে অন্তত মানুষের কথা বলা ও মুক্তভাবে চলাফিরা করিবার স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন, যাহাতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও হতাশা সান্ত্বনার জন্য হইলেও ভাষা খুঁজিয়া পায়।
একটি গণতান্ত্রিক দেশের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হইল-‘ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার’ তথা ভয় হইতে মুক্তি; কিন্তু ভয় হইতে মুক্তি আমাদের কবে মিলিবে? ১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট তাহার স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে ‘ফোর ফ্রিডমস’ বা চারটি স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেন। তাহার মধ্যে রহিয়াছে-মতপ্রকাশ ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা এবং দারিদ্র্য ও ভয় হইতে মুক্তি। আর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক যেই সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা দেওয়া হয়, সেইখানে এই ‘ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার’-এর কথাও বলা হয়। কেননা ভয়ভীতির মধ্যে থাকিয়া মানুষ সুষ্ঠু ও সুস্থভাবে বাঁচিয়া থাকিবার কথা চিন্তা করিতে পারে না; কিন্তু পরিতাপের বিষয়, উন্নয়নশীল দেশসমূহে আজ ভয়ের সংস্কৃতি জাঁকিয়া বসিয়াছে। ভয়ভীতির কারণে এই সকল দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হইতেছে। অতএব, এই সকল দেশে এই ভয়কে জয় করিতে হইলে উদার গণতান্ত্রিক মনোভাব পোষণ ও আচরণের কোনো বিকল্প নাই। এই জন্য সর্বত্র পরমতসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়িয়া তোলা প্রয়োজন। প্রয়োজন অন্যের অধিকারের প্রতি সজাগ ও সচেতন থাকা। বিশেষত এই সকল দেশের নেতৃবৃন্দের শুভবুদ্ধির পরিচয় দেওয়া দরকার। দরকার প্রতিটি নাগরিকের জান ও মালের মূল্য বিবেচনায় লইয়া তাহাদের মৌলিক অধিকারগুলি বাস্তবায়ন করা। এই ব্যাপারে রাষ্ট্রের যেই মহান দায়িত্ব রহিয়াছে সেই দায়িত্ব কতটা সুচারুভাবে প্রতিপালন করা হইতেছে তাহাই দেখিবার বিষয়।