রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির নামটি বহুল আলোচিত। তিনি ১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দে ‘দ্য প্রিন্স’ নামক গ্রন্থে রাষ্ট্রশাসনের জন্য যেই সকল নীতি ও পরামর্শ দিয়া গিয়াছেন, তাহা পাশ্চাত্যের রাজনীতিচিন্তার বাঁকবদল ঘটাইয়াছিল। শাসক কীরূপে ক্ষমতা দখল ও সংরক্ষণ করিবে, কীরূ পে প্রজা শাসন করিবে, কীরূপে শত্রুকে দমন করিবে-এই সকল বিষয়ে ম্যাকিয়াভেলি যে কথিত বাস্তববাদী অথচ নীতিবর্জিত নির্দেশ দিয়াছেন, তাহা তাহার খ্যাতি যেমন বিস্তৃত করিয়াছে, তেমনই তাহার দর্শনকেও করিয়াছে বিতর্কিত। ম্যাকিয়াভেলির সারকথা কয়েকটি মূলনীতির মধ্যেই প্রকাশিত। প্রথমত, রাজনীতির কেন্দ্রে থাকিবে ‘ক্ষমতা’-নৈতিকতা বা মানবিকতা নহে। দ্বিতীয়ত, তিনি জোর দিয়া বলিয়াছেন, রাষ্ট্রশাসনে নীতিশাস্ত্র ও বাস্তবশক্তি এক নহে। শাসককে অনেক সময় নৈতিকতার প্রচলিত ধারণার বাহিরে গিয়াও কঠোর বা প্রতারণাপূর্ণ হইতে হয়। তৃতীয়ত, প্রজা শাসকের প্রতি ভালোবাসা রাখিলে ভালো, কিন্তু ভয় অনেক বেশি স্থায়ী ও নিশ্চিত নিয়ন্ত্রণ আনে। চতুর্থত, শাসককে সিংহের ন্যায় শক্তিশালী এবং শিয়ালের ন্যায় ধূর্ত তথা কৌশলী হইতে হইবে।
gnews দৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, ম্যাকিয়াভেলির এই দর্শন তাহার সময়কাল হইতে আজও অবধি বিপুল সমালোচনার জন্ম দিয়াছে। অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক মনে করেন, ম্যাকিয়াভেলির এই দৃষ্টিভঙ্গি জনগণের মঙ্গল ও মানবিক নৈতিকতার নিদারুণ উপেক্ষা। ক্ষমতা রক্ষা করিবার জন্য প্রতারণা, ভীতি প্রদর্শন, এমনকি নৃশংসতা অবলম্বন করিবার পরামর্শ মানবিক আদর্শ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিপরীত। কারণ, গণতন্ত্রে রাজা নহে, প্রজাই দেশের মালিক। গণতন্ত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান ভিত্তি হইল জনগণের স্বাধীন ইচ্ছা, তাহাদের অধিকার, তাহাদের মতপ্রকাশ। অথচ ‘দ্য প্রিন্স’-এর নির্দেশনা শাসককে জনগণের প্রতিনিধি নহে, বরং একক ক্ষমতার অধিকারী রাজপুরুষ রূপে প্রতিষ্ঠা করে। এখন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো শাসক যদি ম্যাকিয়াভেলির বাণী অনুসরণ করে, তবে সেই শাসকের পথ অবধারিতভাবেই স্বৈরাচার ও অমানবিকতার দিকে গড়াইয়া যাইবে। ভয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত শাসন জনগণের আস্থা ও সমর্থন হারাইয়া ফেলে। অন্যদিকে, একবার শাসক অজনপ্রিয় হইলে, ক্ষমতায় টিকিয়া থাকিবার জন্য সে আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে; বিরুদ্ধ কণ্ঠ দমন করে, নাগরিক অধিকার হরণ করে। কারণ, সে জানে ক্ষমতা হারাইলেই তাহার সর্বনাশ। অতএব, যেই উপদেশ শাসককে সর্বদা ভয়ের রাজনীতি চর্চায় বাধ্য করে, তাহা কোনো গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নহে।
দুঃখজনক বিষয় হইল, তৃতীয় বিশ্বের বহু শাসক যেন আজও ‘দ্য প্রিন্স’-এর শিক্ষা লইয়াই রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তাহারা মনে করেন, জনতাকে ভয় দেখাইয়া, বাস্বাধীনতা খর্ব করিয়া, চলাচল ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় শিকল পরাইয়া দেশ শাসন করিলে তাহার বিরুদ্ধ উচ্চারণ কেহ করিবে না। অথচ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি ভিন্ন-এইখানে মানুষের অধিকার, মতপ্রকাশ, স্বাধীন চলাফেরা, ন্যায়সংগত বিচার ও সমতার নিশ্চয়তাই রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও স্থিতির মূল। একটি দেশের সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রশাসনের জটিল তত্ত্ব ও ক্ষমতার খেলা কিংবা কে শাসন করিল-এই সকল ব্যাপারে খুব একটা মাথা ঘামায় না। কিন্তু যখন তাহাদের মৌলিক স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়, তখন তাহারা স্পষ্ট বুঝিতে পারে যে রাষ্ট্র অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছে। বাস্বাধীনতা ও চলাফেরার স্বাধীনতা হরণ মানেই নাগরিক জীবনের শ্বাসরোধ। এই শ্বাসরোধের ফলেই জন্ম লয় অশান্তি, ক্ষোভ ও বিদ্রোহ।
অতএব আজকের যুগে, যখন গণতন্ত্রের নীতি বিশ্ব জুড়িয়া স্বীকৃত, তখন ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’-এর মতো রাষ্ট্রকে শাসন করিবার জন্য ভয়, প্রতারণা ও কঠোরতা অবলম্বন অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, একটি রাষ্ট্রে বৃহত্তর জনগণের আস্থা, ন্যায়নীতি ও সাধারণ মানুষের স্বাধীনমতো জীবনযাপনই হইল আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মূল ভিত্তি। এই আধুনিক সময়ে যেই রাষ্ট্রের শাসক ইহা ভুলিয়া যান, সেই শাসক বুদ্ধিমান নহে, নিতান্তই বোকা। ফলে, এই ধরনের রাষ্ট্রশাসকের জন্য দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তকরা শুধু করুণাজ্ঞাপনই করিতে পারেন। কারণ, এই ধরনের শাসককে তাহাদের নির্বুদ্ধিতার শাস্তি একসময় পাইতেই হয়। এই জন্য শাসকদের দূরদর্শী হইতেই হয়। নচেৎ জনগণের ভোগান্তির শেষ থাকে না।