
সিলেটের গোলাপগঞ্জে গৃহবধূ ঝুমকি রানী দেবকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার বাবা। বাবার অভিযোগ, যৌতুকের জন্য ঝুমকিকে হত্যা করেন তার স্বামী ও স্বামীর পরিবারের লোকজন।
শনিবার (৬ জুন) বিকেলে সিলেট জেলা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেন ঝুমকির বাবা ও এলাকার বাসিন্দারা।। এসময় তারা ঝুমকি হত্যার ন্যায় বিচার দাবি করেন।
গত ২৪মে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার হেতিমগঞ্জ থেকে ঝুমকির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত ঝুমকী রানী দেব গোলাপগঞ্জের বাঘা ইউনিয়নের গৌরাবাড়ি গ্রামের সন্নৎ কুমার দেবের মেয়ে। সন্নৎ পেশায় সবজি বিক্রেতা। প্রায় দুই মাস আগে একই উপজেলার হেতিমগঞ্জ পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা চঞ্চল দাসের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
ঝুমকির মৃত্যুর ঘটনায় গোলাপগঞ্জ থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। তবে ঝুমকির বাবার দাবি, থানায় হত্যা মামলা করতে চাইলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। পরে তারা গত ২ জুন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
শনিবার সংবাদ সম্মেলনে সন্নৎ দেবের পক্ষে তার বক্তব্য পড়ে শোনান তার ভাই হরিপদ দেব।
লিখিত বক্তব্যে সন্নৎ কুমার দেব জানান, কিছুদিন পূর্বে আমার আত্মীয় স্বজনের সহযোগীতায় তার একমাত্র ছেলে কৃষ্ণ দেবকে দুবাই পাঠিয়েছেন। তবে ভিসা সংক্রান্ত জটিলতায় সেখানে সে বর্তমানে কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সে নিজেও রয়েছে বেকায়দায়।
তিনি বলেন, আমার একমাত্র উপার্জনের উপর সংসার নির্ভশীল। তিন কন্যার সবাইকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বড় মেয়ে ঝুমকি দেব ২০২৪ সালে ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে। ঝুমকি দেবকে গত ৯ মার্চ বিয়ে দেই।
সন্নৎ দেব জানান, চঞ্চল আমার মেয়ের চেয়ে কম শিক্ষিত ও একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো চাকরি করে। আমি গরীব হলেও মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে বিয়েতে যথাসাধ্য সব মালামাল দিয়েছি। বিয়ের পর জামাই ও তার পরিবারের সদস্যরা মেয়েকে নাইওর দিত না। বিয়ের অল্পদিন পর হতে মেয়ে জামাই চঞ্চল দাস, তার অপর দুই ভাই সঞ্জিত দাস ও রঞ্জিত দাস, তাদের স্ত্রী নন্দিনী দাস ও নিপা দাস জেমি এবং একান্নবর্তী চাচাতো ভাই স্বপন দাস পরস্পর যোগসাজশে আমার মেয়েকে যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে শুরু করে। কম দামী ফার্নিচার দেয়ায় মেয়েকে খোঁটা দিত। স্বর্ণের চেইন না দেয়ায় চঞ্চল দাস গালিগালাজ করতো। কমদামী ফার্নিচার বদলে পিত্রালয় থেকে নতুন ফার্নিচার আনার জন্য চাপ দিতো।
সন্নৎ দেব বলেন, সম্প্রতি মেয়ের জামাতা চঞ্চল দাস পরিবারের সদস্যদের প্ররোচনায় আমার দুবাই প্রবাসী পুত্রের নিকট থেকে ৫ লাখ টাকা এনে দিতে মেয়েকে চাপ দেয়। যৌতুক প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করলে মেয়ে জামাই চঞ্চল দাস শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত। পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণও ঝুমকী রানীকে তাদের দাবি আদায়ের জন্য নানারূপ মানসিক নির্যাতন করত। তাদের নির্যাতনের কারণে ঝুমকি বিপর্যস্থ হয়ে পড়ে। ক্রমাগত নির্যাতনের বিবরণ তার দুই বোন অমি দেব ও সুমি দেবকে জানায়।
মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে গত ১২ মে ঝুমকি বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে অবস্থানকালে প্রায়ই তাকে বিমর্ষ দেখাত। গত ২২ মে ঝুমকীকে নিয়ে তার শ্বশুড়ালয়ে যান সনৎ দাস। তখন মেয়ে জামাই চঞ্চল দাস শ্বশুড়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে অনীহা প্রকাশ করে। ঝুমকীর প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দিন ২৪মে তার মেয়ের ব্যবহৃত মোবাইল থেকে ১২টা ৩৮ মিনিটে ফোন আসে। ফোন রিসিভ করে ঝুমকীর বোন অমি দেব। ফোনে ৪ মিনিট কথা বলে। এরপর থেকে তার সাথে পরিবারের সকল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় ওই দিন সন্ধ্যা ৭টা ১ মিনিট থেকে ৭টা ৯ মিনিটের সময় ঝুমকীর স্বামী চঞ্চল দাসের বড় ভাই সঞ্চিত দাস তার ব্যবহৃত মোবাইল থেকে কল দিয়ে অমি দেবকে বলে- তুমি তোমার বোনের মোবাইলে ফোন দিয়ে তার খোঁজ নাও।
সঞ্চিত দাস এভাবে পরপর দুইবার ফোন দিয়ে একই কথা বলে। অমি দেব ও সুমি দেব এতে বিচলিত হয়ে ঝুমকি দেবের মোবাইলে বারবার কল দিলেও কেউ ফোন রিসিভ করেনি। এ অবস্থায় সন্ধ্যা ৭টা ৫৪ মিনিটের সময় সঞ্চিত দাসের মোবাইলে ফোন দিয়ে ঝুমকি দেব গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা খবর দেন।
তিনি বলেন, আমরা গিয়ে দেখতে পাই, ঝুমকীর স্বামী চঞ্চল দাসসহ পরিবারের সকল সদস্য পলাতক। ঝুমকীর নিথর দেহ তার ভাসুর রঞ্জিত দাসের শয়নকক্ষে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলানো। পা দু’টো খাটের বিছানায় লাগানো, জিহ্বা মুখের ভেতরে ঢুকানো, দুই হাতের কব্জিতে শক্ত করে বাঁধা এবং গলার মাঝামাঝি সমান্তরাল রশির দাগ পরিলক্ষিত হয় সকলের। দরজার নীচের ছিটকিনি লাগানো থাকলেও সেটা যেকেউ খুলতে পারে। ঘরের ভেতর কুছুরি দরজা দিয়ে যাতায়াতের সুযোগ আছে।
সন্নৎ দেব বলেন, আমার মেয়েকে হত্যা করে নিথর দেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। চঞ্চল দাসসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যৌতুকের কারণে পরিকল্পিতভাবে মেয়েকে হত্যা করেছে। পরবর্তীতে হত্যাকান্ডকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াস চলছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাইলেও থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। নিরূপায় হয়ে গত ২ জুন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দন্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় গোলাপগঞ্জ সি.আর মামলা নং- ২০৫/২০২৬ইং দায়ের করি।
সন্নৎ দেব ও তার এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, যদি তাদের মেয়ে আত্মহত্যা করেই থাকে, তাহলে এই মৃত্যুর প্রচোরণার জন্য দায়িদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে তাদের দাবি এটি হত্যাকাণ্ড। তাই ঘটনাটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এলাকাবাসীর পক্ষে কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে ছিলন- আব্দুল কাদির, সেলিম মাহবুবুল আলম, নজরুল ইসলাম, কাদির হোসেন বাবুল, আবুল কালাম বাবুল, ফুরুক আল মাহমুদ, আরমান আলী, বুলবুল আহমদ প্রমুখ।
সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি : নূরুর রশীদ চৌধুরী, সম্পাদক : ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক : ফাহমীনা নাহাস
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : অপূর্ব শর্মা