
৫ আগস্ট ২০২৪- বাংলাদেশের জন্য একটি কলঙ্কময় দিন। এই দিনে দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার হঠাৎই পতিত হয়। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই নাটকীয় ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি সরকার পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং এর মাধ্যমে দেশপ্রেম, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে এক ভয়ানক ষড়যন্ত্রের দরজা খুলে যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরবর্তী সময়েই দেখা যায় দেশের অন্তত ২৯টি জেলায় বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। যার নেতৃত্বে ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ধর্মীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী।
সরকার পতনের পর রাষ্ট্রযন্ত্র কার্যত ভেঙে পড়ে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা শিথিল হয়ে যায়, প্রশাসনের নির্দেশনা বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে, এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদেরকে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানে দেখাতে গিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। এই প্রশাসনিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত সংগঠিত হয়ে ওঠে জামায়াত-শিবির এবং তাদের সমমনা গোষ্ঠী। বহু জায়গায় দেখা গেছে, তারা পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে আক্রমণ চালায়। মন্দির ভাঙচুর, প্রতিমা দাহ, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া-এসব যেন একেবারে পূর্বপরিকল্পিত ছিল।
এই ঘটনায় শুধু ভৌত ক্ষতিই হয়নি, বরং তৈরি হয়েছে গভীর মানসিক ক্ষতি। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ সত্তার উপরই আঘাত হানে।
যারা মনে করেছিলেন জামায়াতে ইসলামী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে, তারা ইতিহাস ভুলে গেছেন। জামায়াত কোনো রাজনৈতিক দল নয়, তারা একটি আদর্শগত মিশন পরিচালনাকারী সংগঠন, যার মূল উদ্দেশ্যই হলো বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে দিয়ে এখানে একটি ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘদিন তারা নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে চুপ ছিল, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন, এনজিওর ছদ্মবেশ এবং বৈদেশিক অর্থায়নে তারা যে নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে-তা এখন প্রকাশ্যে এসেছে।
৫ আগস্টের ঘটনার পর যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব দেখা গেছে, তা ছিল এই ঘুমন্ত কোষগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা। জামায়াত তাদের পুরনো কৌশলে ফিরে গিয়ে গ্রামে-গঞ্জে তরুণদের মগজ ধোলাই করে উস্কানি ছড়িয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়েছে, এবং এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয় ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করলে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়। এটি শুধু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি ছিল বহির্বিশ্বে ও দেশের অভ্যন্তরে একটি সুগভীর ষড়যন্ত্রের ফলাফল। জামায়াত, বিএনপি, এবং এক শ্রেণির তথাকথিত সুশীল সমাজ মিলে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালিয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, মানবাধিকার ইস্যু, নির্বাচনের প্রশ্ন ইত্যাদি সামনে এনে তারা আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।
এই ষড়যন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পতনের সুযোগ নিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করা এবং সেই অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে জামায়াত ও উগ্র ইসলামপন্থীদের পুনরুত্থান ঘটানো। অর্থাৎ, এক ধরনের ‘পলিসি-ভ্যাকুয়াম’ তৈরি করে রাষ্ট্রকে হাইজ্যাক করার চেষ্টা।
৫ আগস্টের পরের দশদিনে যে সহিংসতা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে, অন্তত ৮০টিরও বেশি মন্দির ও গির্জায় হামলা হয়েছে, ৩৫০টির বেশি সংখ্যালঘু পরিবার ঘরছাড়া হয়েছে, এবং ১২ জনের অধিক সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এসব হামলা ছিল ভয়ংকর কৌশলে পরিচালিত—প্রথমে গুজব ছড়ানো, তারপর উস্কানিমূলক মিছিল, এরপর পরিকল্পিত হামলা। অনেক জায়গায় দেখা গেছে, পুলিশের উপস্থিতিতেও হামলাকারীরা দমন হয়নি, বরং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা থেকেই বোঝা গেছে যে প্রশাসনিক কাঠামো কী ভয়াবহভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
শুধু সংখ্যালঘুরাই নয়, সহিংসতার শিকার হয়েছেন হাজারো আওয়ামী লীগ কর্মীও। যাদের অপরাধ ছিল তারা ‘শেখ হাসিনার লোক’। তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি পরিবারের ওপরও হামলা চালানো হয়েছে। বহু নেতা-কর্মীকে পালিয়ে থাকতে হয়েছে, অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই? যে বাংলাদেশে ধর্মের নামে মানুষ হত্যা হয়, সংখ্যালঘুদের শত্রু মনে করা হয়, নারী-শিশুর নিরাপত্তা থাকে না, মৌলবাদীরা শাসন করে? নাকি আমরা সেই বাংলাদেশ চাই, যে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, মানবতা এবং জাতিগত সমতার ভিত্তিতে?
আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করি, যারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই দেশকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছাতে দেখেছি-আমরা জানি, বাংলাদেশ কখনোই এই উগ্রবাদীদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন একটি সর্বাত্মক জাতীয় পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা।
প্রথমত, রাষ্ট্রকে দ্রুত গতিশীল করে তুলতে হবে, প্রশাসনের মধ্যে যারা উগ্রবাদীদের সঙ্গে আপস করেছে তাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ৫ আগস্টের পরবর্তী সহিংসতার বিচার করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে কেউ রাষ্ট্রীয় শূন্যতার সুযোগ নিয়ে জাতির হৃদয়ে আঘাত করতে না পারে।
তৃতীয়ত, সংখ্যালঘুদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সরকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
চতুর্থত, আওয়ামী লীগ এবং সকল প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
৫ আগস্ট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে- স্বাধীনতা শুধু অর্জন করলেই হয় না, তা রক্ষা করতে হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জামায়াতের উত্থান আমাদেরকে ইতিহাসের একটি ভয়ানক অধ্যায়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই মুহূর্তে আমাদের সজাগ থাকতে হবে, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, এবং অবশ্যই আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার পাশে থাকতে হবে।
বাংলাদেশ শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, এটি একটি আদর্শ। সেই আদর্শকে রক্ষা করার শপথ নিয়েই আমরা এগিয়ে যাবো, বাধা আসবে, ষড়যন্ত্র হবে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অমলিন থাকবে—এই প্রতিজ্ঞা আমাদের অবিচল রাখতে হবে।
লেখক :
আহবায়ক : বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
জাউয়াবাজার ইউনিয়ন শাখা, ছাতক, সুনামগঞ্জ।