যুগভেরী ডেস্ক ::: মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ভূমিউড়া গ্রামে দূর্গাপূজা চলাকালে মন্ডপে হামলা ও মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হন ১১ জন সনাতন ধর্মালম্বী লোক। শুক্রবার (১৫ অক্টোবর) বিজয়ী দশমীর সকালে রাজনগর উপজেলার ভূমিউড়া গ্রামের সঞ্জয় ভট্টাচার্য্যের বাড়িতে পূজা মন্দিরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ হামলায় সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য ও তার পুত্র সুবির ভট্টাচার্য্যসহ পুজায় আগত ১১ জন সনাতন ধর্মালম্বীরা আহত হন।
আহতরা হলেন- রাজনগর উপজেলার ভূমিউড়া গ্রামের সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য, সঞ্জয় ভট্টাচার্য্যরে ছেলে সুবির ভট্টাচার্য্য, একই গ্রামের সুব্রত ভট্টাচার্য্য, জয়ন্তী ভট্টাচার্য্য, বর্ষণ চৌধুরী, সমিরণ সাহা, সুজিত দাস, প্রবীত্র ভট্টাচার্য্য, সুভাস দাস, রনি চক্রবর্তী, সোহম ভট্টাচার্য্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শারদীয় দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমীর দিন গত বুধবার (১৩ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লা জেলার নানুয়ার দিঘীরনপাড়ে গভীর রাতে দূর্গা মন্দিরে হনুমানের পায়ের নিচে কুরআন রাখাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলমান ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। পরে স্থানীয় মুসলিমরা মন্দিরে হামলা ও ভাংচুর করে। এর জেরে ধরে বিজয়ী দশমীর সকালে রাজনগর উপজেলার ভূমিউড়া গ্রামের সঞ্জয় ভট্টাচার্য্যের বাড়িতে পূজা মন্দিরে হামলা চালায় স্থানীয় কিছু উগ্র মৌলবাদী মুসলমান সন্ত্রাসীরা। শুক্রবার (১৫ অক্টোবর) দশমী পূজার দিন দুপুর ২টার দিকে এলাকার হেফাজত নেতা মো. জুবের আহমদ ও মো. সেলিম মিয়ার নিতৃত্বে ৩৫ থেকে ৪০ জন উগ্র মৌলবাদী মুসলমান সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ‘আল্লহু আকবার ধ্বনি’ দিয়ে মিছিল করে অতর্কিত ভাবে ভূমিউড়া গ্রামের সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য ও তার ছেলে সুবির ভট্টাচার্য্যসহ মন্দিরে আগত ভক্তদের উপর হামলা চালায়। পরে মন্দিরের মূর্তি ভাঙচুর করে সন্ত্রাসীরা। এসময় সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য ও তার ছেলে সুবির ভট্টাচার্য্য হামলাকারীদের থামাতে গেলে উগ্র মৌলবাদী ওয়াসিদ মিয়া তাদের মাথায় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলে মারাত্মকভাবে আহত হন তারা। এসময় তারা আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ হামলায় পুজায় আগত কয়েকজন ভক্তরাও আহত হয়েছেন। পরে স্থানীয়রা তাদেরকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। তবে সঞ্জয় ভট্টাচার্য্যে অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসলে হামলাকারিরা পালিয়ে যায়।
স্থানীয় ভক্তরা জানান, “সঞ্জয় ভট্টাচার্য্যের বাড়িতে এলাকার হেফাজতে ইসলাম নেতা মো. সেলিম মিয়া ও মো. জুবের আহমদসহ সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছে। কুমিল্লার নানুয়ার দিঘীরণপাড়ে দূর্গা মন্দিরে হনুমানের পায়ের নিচে পরিকল্পিত ভাবে কুরআন রাখে সমগ্র বাংলাদেশের মসজিদের মাইকে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের অবমাননার কথা প্রচার করা হচ্ছে। যার প্রেক্ষিতে আমাদের রাজনগর উপজেলার ভূমিউড়া গ্রামের সঞ্জয় ভট্টাচার্য্যের বাড়িতে এলাকার হেফাজতে ইসলাম নেতা মো. সেলিম মিয়া ও মো. জুবের আহমদ হামলা করে আহত এবং ভাংচুর করে। তারা হিন্দু ধর্মের মানুষের উপর হামলা এবং অত্যাচার করে দেশে শত শত দূর্গা মন্দিরে আক্রমণ করা হচ্ছে। ভেঙে ফেলা হয় মূর্তি ও প্রতিমা। যা এক কলঙ্কময় রক্তাক্ত শারদ।”
আহত সুবির ভট্টাচার্য্য বলেন, “গতকাল বৃহস্পতিবার নবমীর পূজা চলাকালে সকাল ১১টার দিকে আমাদের বাড়ির পূজা মন্দিরে আসেন এলাকার হেফাজতে ইসলাম নেতা মো. সেলিম মিয়া ও মো. জুবের আহমদসহ ৬ জন। তারা আমাকে পূজা ও গান-বাজনা বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়। কুরআন অবমাননা করে মূর্তি পূজা করতে নিষেধ দেন। এক পর্যায়ে আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি। পূজা করা আমাদের নাগরিক অধিকার। তোমরা আমাদের পূজা বন্ধ করার নির্দেশ দিতে পারো না। আমি এক পর্যায়ে তাদের বলি, কোন ভাবে এই দূর্গাপূজা বন্ধ হবেনা। আমরা পূর্ব পুরুষ থেকে এই বাড়িতে দূর্গাপূজা করে আসছি। এটা আমাদের ধর্ম। কারো কথায় পূজা বন্ধ করতে পারবো না। তারা খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে গালাগালি করে, ‘মালাউনের বাচ্চা তোদের দেখে নেব’ হুমকি দিয়ে চলে যায়। আমাদের পূজার কার্যক্রম নিয়ম মতো করে যাই এবং রাতের অনুষ্ঠান গুলো সংক্ষিপ্ত করি। তবু আজ (শুক্রবার) দশমী পূজার দিন দুপুর ২টার দিকে হেফাজত নেতা মো. জুবের আহমদ ও মো. সেলিম মিয়ার নিতৃত্বে ৩৫ থেকে ৪০ জন উগ্র মৌলবাদী মুসলমান দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ‘আল্লহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে মিছিল করে অতর্কিত ভাবে আমাদের উপর ও দূর্গা মন্দিরসহ ভক্তদের উপর হামলা করে। আমি ও আমার বাবা সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য হামলাকারীদের থামাতে গেলে ওয়াসিদ মিয়া আমার ও আমার বাবার মাথায় আঘাত করলে আমরা মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যাই। এসময় আমাদের বাড়িতে আসা কয়েকজন ভক্তদের উপরও তার হামলা চালায়। পরে স্থানীয়রা আমাদেরকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। তবে আমার বাবার অবস্থা আশঙ্কাজনক আছেন। হামলায় আমাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
রাজনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, “শুক্রবার দুপুরে ভূমিউড়া গ্রামের সঞ্জয় ভট্টাচার্য্যের বাড়িতে পূজা চলাকালে গান বাজনা নিয়ে স্থানীয় কিছু উগ্র মৌলবাদী মুসলমানরা হামলা করে। কয়েকজন আহত হয়। পরে বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে গেলে কাউকে পায়নি। পুলিশী প্রহরায় বিসর্জন সমাপ্ত হয়েছে। এখনও কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে আমরা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করবো।”