দলবদলের ঢেউ: নির্বাচনের আগে বাড়ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা

Daily Jugabheri
প্রকাশিত October 1, 2025
দলবদলের ঢেউ: নির্বাচনের আগে বাড়ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা

মতিউর রহমান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক :

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই দেশের রাজনীতিতে বাড়ছে অস্থিরতা। বিশেষ করে সিলেট বিভাগজুড়ে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠন থেকে বিএনপিতে যোগদানের হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। এই রাজনৈতিক পালাবদল যেন নির্বাচনের আগে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য মাস ঘোষণা করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস। তার এই ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয় উল্লেখযোগ্য দলবদলের ধারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সারাদেশের তুলনায় সিলেট বিভাগেই এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগদানের হার ছিল ৩-৫ শতাংশের মধ্যে। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭-১০ শতাংশে—যা পূর্বের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুসারে, জুলাই ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ সময়কালে সিলেট বিভাগের চারটি জেলায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন থেকে বিএনপিতে যোগদানকারী নেতা-কর্মীর সংখ্যা যথাক্রমে: সিলেট : ৯,৩৫৭ জন, সুনামগঞ্জ: ৮,৯২০ জন, মৌলভীবাজার: ১০,৩০৮ জন, হবিগঞ্জ: ৭,৫৭৬ জন।

এই তালিকায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মৌলভীবাজার-১ আসন (বড়লেখা ও জুড়ি)। এই আসন থেকেই সর্বোচ্চ দলবদল হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ হল—এই আসন থেকে আগের সরকারের সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন জনাব শাহাবুদ্দিন আহমদ।উপজেলা চ্যায়ারম্যান ,পৌরসভা ,ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড গুলোতেও আওয়ামী লীগের জন প্রতিনিধি থাকায় এই আসন আওয়ামী লীগের ঘাটিতে পরিণত হয়েছিল। নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ এখনো অনিশ্চিত কাজেই তারা দলে দলে নির্বাচনের মাঠে বিএনপিকে বাছাই করতেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দলবদলের ঢেউ একদিকে যেমন বিএনপির জন্য শক্তি সঞ্চার করছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ভিত কাঁপিয়ে তুলেছে। নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হতে পারে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হওয়ায় আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিক বিবেচনায় বিএনপিকেই বেছে নিচ্ছে। বিশেষ করে, নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, বিএনপিতে যোগদানের প্রবণতাও তত বাড়ছে। এছাড়া, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত ভূমিকার কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ ও তার নেতাকর্মীরা কখনোই এই দলটিকে ক্ষমতায় দেখতে চাইবে না। জামায়াতের প্রতি এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সুযোগ কাজে লাগাতে বিএনপি কৌশলগতভাবে এগোচ্ছে। বর্তমানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলে তা বিএনপির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সুযোগ হয়ে দাঁড়াবে। সে কারণে বিএনপি গোপনে আওয়ামী লীগপন্থীদের আশ্রয় দিয়ে নিজস্ব ভোট ব্যাংক মজবুত করার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো মনে করছে— যদি জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় আসে, তবে জামায়াতের যেসব নেতা-কর্মী অতীতে ফাঁসি, বিচারবহির্ভূত হত্যা, খুন ও গুমের শিকার হয়েছেন, তাদের বিচারের দাবি তোলা হবে। এর ফলে আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। অপরদিকে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে এসব ঘটনা নিয়ে বিচারের চাপ অনেকটা হ্রাস পেতে পারে বা বিষয়গুলো মাফ হয়ে যেতে পারে— এমন ধারণা থেকেই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, তারা দলে দলে বিএনপিতে যোগদান করছেন এবং বিএনপিও গোপনে তাদের স্বাগত জানাচ্ছে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ, বিএনপি নির্বাচনে এককভাবে জয়লাভের জন্য বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকার তথা শেখ হাসিনার বাহিনীর সাথে আঁতাত করছে। তারা অভিযোগ করছে— বিএনপি ভোটার সংখ্যা বাড়ানোর নামে সরকার-সমর্থিত বাহিনীর সহায়তায় ভোটকেন্দ্র দখল ও জালিয়াতির মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চায়।

মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা ও জুড়ি) সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী জনাব আমিনুল ইসলাম এক বক্তব্যে বলেন—“বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমাদের ৫ জন কর্মী— শহীদ জালাল, লোকমান, আলমাসসহ অন্যরা আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। অথচ আজ দেখা যাচ্ছে, সেই চিহ্নিত সন্ত্রাসীদেরই বিএনপির বর্তমান সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে। তারা আবার আমাদের নেতা-কর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনী পরিবেশের পরিপন্থী।” তিনি বলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা কর্মীরা এখনো মামলার বুজা নিয়ে চলতে হচ্ছে।

এই সমস্ত পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়— রাজনীতির ময়দানে এখন বিশ্বাস, নীতি এবং আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার হিসাব-নিকাশই বড় হয়ে উঠেছে। ফলে ভবিষ্যতের নির্বাচন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ ও প্রশ্ন বাড়ছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গুম হওয়া বড়লেখা উপজেলার সাবেক ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা হোসাইন বিন ইসহাক সম্প্রতি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টে এক গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন: “কাঠালতলী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সন্ত্রাসী এনাম উদ্দিন এবং তার অনুসারী ছাত্রলীগ নেতা শাহ আলম বর্তমানে নাকি ইউনিয়ন যুবদলের নেতা! মিডিয়ায় দেখলাম, তারা বিএনপির প্রার্থী শরিফুল হক সাজুর সাথে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। অথচ ২০১৪ সালে আমাকে গুম করার ঘটনায় ওই এনাম উদ্দিনের নেতৃত্বে যে দলীয় ক্যাডার বাহিনী কাজ করেছিল, তাদের সাথেই ছিলেন এই শাহ আলম।

সেই সময় শাহ আলম আমাকে ‘শিবির’ বলে যত গালাগাল করেছে, হয়তো আর কেউ এতটা করেনি। যখন আমাকে গুমের অবস্থা থেকে উদ্ধার করে বড়লেখা থানা হয়ে মৌলভীবাজার জেলা হাজতে নেওয়া হচ্ছিল, তখন কাঠালতলী বাজারে উপস্থিত থাকা ছাত্রলীগ সভাপতি কাউসার রনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছিল। আজ এইসব লোকজনকেই বিএনপির হাইকমান্ডের ঘনিষ্ঠ বলে দেখা যাচ্ছে— বিষয়টি আমাকে ব্যথিত করেছে। শুধু শাহ আলম নয়, বড়লেখা উপজেলার বহু পরিচিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকেই এখন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে দেখছি।”

হোসাইন বিন ইসহাকের এই পোস্ট জামায়াতসহ অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বিএনপির এই দলবদলকারী রাজনীতির পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী?

সর্বোপরি, রাজনৈতিকভাবে জামায়াতকে কোণঠাসা করতে বিএনপির এই কৌশল—অর্থাৎ অতীতের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসেবেই পরিচিত ব্যক্তিদের দলভুক্ত করা—জামায়াতের জন্য এক গুরুতর দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে যে, বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আদর্শ ও মূল্যবোধের জায়গায় এখন স্থলাভিষিক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও প্রয়োজনভিত্তিক মিত্রতা। ফলে, এক সময়ের দমন-পীড়নের শিকাররা এখন দেখতে পাচ্ছেন তাদের দুশমনরা একই রাজনীতির ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন