
বিশেষ প্রতিনিধি, বিশ্বনাথ (সিলেট):
সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ৫নং দৌলতপুর ইউনিয়নে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতার অনুসারীদের বিরুদ্ধে এক আওয়ামী লীগ নেত্রীর ফাঁকা বসতবাড়িতে যৌথ হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালানের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল (৭ অক্টোবর) দুপুরে দৌলতপুর ইউনিয়ন বিএনপির বর্তমান সভাপতি শুকুর আলী এবং ইউনিয়ন জামায়াতের বর্তমান সভাপতি খুরশেদ আলমের অনুসারীরা যৌথভাবে এলাকার ৫ নং দৌলতপুর ইউনিয়ন যুবলীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক হাবিবা বেগমের বসতবাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা বাড়ির তালা ভেঙে অনধিকারভাবে ঘরে ঢুকে মূল্যবান আসবাবপত্র ও মালামাল ভাঙচুর করে তাণ্ডব চালায়। তবে ঘটনার পূর্বেই নিরাপত্তার স্বার্থে পরিবারের সদস্যরা (মা ও বোনেরা) আত্মগোপনে থাকায় শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পান। উল্লিখিত নেত্রী হাবিবা বেগম ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, হাবিবা বেগম ২০১৪ সালে ইউনিয়ন যুবলীগের সদস্য হিসেবে রাজনীতি শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ২০১৭ সালে মহিলা বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন, যা ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পর্যন্ত বহাল ছিল। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি স্থানীয় নারী সমাজকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করতে যুব নারী সংগঠন-এর ব্যানারে নানামুখী সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তিনি মাসে একবার নারীদের হস্তশিল্প ও বাণিজ্যিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতেন এবং প্রতি ১৫ দিন পরপর প্রবীণ নারীদের মৌলিক সাক্ষরতা ও সামাজিক সচেতনতামূলক শিক্ষা দিতেন। তাঁর এসব উদ্যোগের ফলে এলাকার বহু নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয় এবং অনেকে নিজের উদ্যোগে ও তাঁর পরামর্শে আয়-রোজগারের পথ খুঁজে পান। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হলেও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়ে কঠোর সমালোচিত হন। এলাকাবাসীর মতে, এই প্রগতিশীল নারী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণেই তৎকালীন ইউনিয়ন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক খুরশেদ আলম উগ্র ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ছিলেন।
অন্যদিকে, তৎকালীন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শুকুর আলী রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে তাঁর বিরোধিতা শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর বিশ্বনাথ থানার প্রশাসনিক অচল অবস্থার সুযোগ নিয়ে এই দুই নেতা এলাকায় নিজস্ব সশস্ত্র বলয় তৈরি করেন এবং নিজ নিজ দলের সভাপতি পদে আসীন হয়ে পুরো এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করেন।
এলাকার একাধিক সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাবিবা বেগমের রাজনৈতিক ও সামাজিক জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে এবং নারী সমাজের অগ্রগতি ও ক্ষমতায়ন বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু থেকেই তাঁর ওপর আক্রোশ ছিল। নেত্রীর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মেটাতেই স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের ক্যাডারদের দিয়ে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এদিকে, আত্মগোপনে থাকা ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান, বর্তমানে এলাকায় তাঁদের ফেরার মতো কোনো পরিবেশ নেই। একই সাথে তাঁরা জীবনের চরম ঝুঁকি ও স্থানীয় পুলিশের তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর অনাস্থা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে জানতে বিশ্বনাথ থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, হামলার বিষয়ে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় থমথমে ও ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।