• ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৭শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

পাহাড়ে এক বছর প্রশিক্ষণ, সমতলে এসে গ্রেপ্তার সিলেটের তুহিনসহ দুই জঙ্গি

Daily Jugabheri
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২২, ২০২২
পাহাড়ে এক বছর প্রশিক্ষণ, সমতলে এসে গ্রেপ্তার সিলেটের তুহিনসহ দুই জঙ্গি

নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্য অভিযোগে এই দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্য অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জঙ্গি দমনে ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষায়িত শাখা সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, এই দুজন জঙ্গি সংগঠনটি পাহাড়ে যে প্রশিক্ষণশিবির খুলেছিল, সেখানে বছরখানেক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাদের একজন সংগঠনের নেতাদের কথার বিরোধিতা করলে তাকে নির্যাতন করা হয়।

গ্রেপ্তার দুজন হলেন সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (২১) ও নাঈম হোসেন (২২)। নাঈম ঢাকার শেরেবাংলা নগরের কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (এটিআই) চতুর্থ সেমিস্টারের ছাত্র এবং সাইফুল সিলেটের একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। নাঈমের বাড়ি চাঁদপুরে, সাইফুলের বাড়ি সিলেটে।

আজ বৃহস্পতিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (সিটিটিসি) মো. আসাদুজ্জামান জানান, ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) সদস্যরা গতকাল বুধবার সিলেট থেকে সাইফুল ও ঢাকা থেকে নাঈমকে গ্রেপ্তার করেন।

তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন বলেছেন, নতুন জঙ্গি সংগঠনের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অনেকেই স্বেচ্ছায় গেলেও আবার অনেককে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ক্যাম্পে গিয়ে অনেকেই ফিরে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শত চেষ্টা করেও সেখান থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না। গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম সিলেট থেকে গত বছরের ১৫ নভেম্বর ‘হিজরতের’ (জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঘরছাড়া) উদ্দেশে বের হন। তিনি একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন, সেখানকার একজন ইমামের মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিজরতে যান। তবে হিজরতে গিয়ে কী করবেন, সেটি সাইফুল জানতেন না।

সিটিটিসি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, সাইফুল দুই সঙ্গীসহ গত বছরের ১৫ নভেম্বর সিলেট থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে প্রথমে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় তাদের সঙ্গে আরও চারজন হিজরতকারীর দেখা হয়। সেখান থেকে তারা বাসে বান্দরবানের দিকে রওনা হন। রাস্তায় তাদের ফোন ও বাসা থেকে নিয়ে আসা টাকা সংগঠনের সদস্যরা নিয়ে নেন। এর মধ্যে তাদের চুল ও দাড়িও কেটে ফেলা হয়। পরে সাইফুল ইসলাম বান্দরবানে গিয়ে দেখেন, তাদের সঙ্গে একই বাসে আরও ১০ জন ‘হিজরতকারী’ এসেছিলেন। বান্দরবান থেকে তারা থানচি যান, সেখান থেকে এক রাতে ১২ ঘণ্টা হেঁটে প্রথম প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পৌঁছান।

অপর দিকে করোনার বিধিনিষেধের মধ্যে ইনস্টিটিউশন বন্ধ থাকায় নাঈম হোসেন তার বাড়ি চলে যান। বাড়ি গিয়ে বিশুদ্ধভাবে কোরআন শিক্ষার জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ভর্তি হন নাঈম। সেই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের এক হুজুরের মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হন তিনি। পরে তিনি ঢাকায় ছাত্রাবাসে চলে আসেন। হল থেকে তিনি কাউকে কিছু না বলে ২ অক্টোবর কুমিল্লায় জঙ্গিদের ‘সেফ হাউসে’ চলে যান। সেখান থেকে নাঈম একইভাবে আরও ৮ থেকে ১০ জনের সঙ্গে থানচি হয়ে পাহাড়ের প্রশিক্ষণশিবিরে চলে যান।

অতিরিক্ত কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, ক্যাম্পে ডেইলি রুটিন মোতাবেক সামরিক কায়দায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো হিজরতকারীদের। সারা দিন তারা বিভিন্ন শারীরিক ও অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিতেন, রাতে তাদের সংগঠনের বিভিন্ন সিনিয়র নেতারা বয়ান দিতেন। এ বয়ানের মাধ্যমে তারা কিছুদিনের মধ্যে বুঝতে পারেন শামিন মাহফুজ এ সংগঠনের প্রধান।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, নতুন জঙ্গি সংগঠনের নেতা শামিন মাহফুজ ক্যাম্পের যেই কক্ষে থাকতেন, সেখানে সশস্ত্র পাহারা থাকত। কুকি-চিনের প্রধান নাথান বম মাঝেমধ্যে ক্যাম্পে এলে শুধু তার কক্ষে গিয়ে আলোচনা করতেন। প্রথম ক্যাম্পটিতে সাত থেকে আট দিন প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর শামিন মাহফুজ সিদ্ধান্ত নেন তারা মিজোরাম সীমান্ত লাগোয়া কোনো পাহাড়ে অথবা মিজোরামের ভেতরে কোথাও প্রশিক্ষণ ক্যাম্প করবেন। কিন্তু সেখানে যেতে না পেরে তারা ফিরে আসেন। পরে তাদের ক্যাম্পে একদিন জেএসএসের সদস্যরা (পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি) হামলা করেন এই ভেবে যে এটি কুকি-চিনের ক্যাম্প। পরে শামিন মাহফুজ সেখান থেকে আরেকটি পাহাড়ে গিয়ে দ্বিতীয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পটি করেন।

এরই মধ্যে সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ সিলেট থেকে আসা তিনজন এ প্রশিক্ষণের সঙ্গে একমত পোষণ না করে বিদ্রোহ করেছিলেন। তারা সেখান থেকে ফেরত আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্রোহের বিষয়টি টের পেয়ে তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালান সংগঠনটির কমান্ডাররা। তাদের সারা দিন গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হতো ও দোররা (বেত্রাঘাত) মারা হতো। এরপর একপর্যায়ে তারা নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আবার সংগঠনের কার্যক্রমে ফিরে আসতে চান। পরে তাদের দিয়ে সারা দিন ক্যাম্পের সব কাজ করানো হতো।

পরে অক্টোবর মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যখন পাহাড়ের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অভিযান চালান, তখন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়েন। এ গ্রুপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সাইফুল ও নাঈম হাঁটতে হাঁটতে একটি মারমা গ্রামে গিয়ে ওঠেন। পরে ওই গ্রামের লোকজন তাদের ধরে কুকি-চিনের কাছে দিয়ে দেন। কুকি-চিন তাদের পরিচয় জানতে পেরে এক মাস নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। শেষে তারা সূর্য ও বাড়িঘর দেখে পাহাড়ি রাস্তা বের করে দীর্ঘ এক মাস হেঁটে বান্দরবান শহরে এসে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। ২৫ নভেম্বর তারা বান্দরবানে আসেন। এরই মধ্যে সিটিটিসির গোয়েন্দা নজরদারিতে তাদের সন্ধান পাওয়া যায়। গোয়েন্দা নজরদারির একপর্যায়ে সিলেট থেকে সাইফুল ইসলাম ও ঢাকা থেকে নাঈমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের আদালতে রিমান্ড আবেদন করে পাঠানো হয়েছে। রিমান্ডে এনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা হবে।

নতুন জঙ্গি সংগঠনের প্রধান শামিন মাহফুজ ও তার পরিবার কোথায় জানতে চাইলে সিটিটিসি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের তদন্ত চলছে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন