
একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও উন্নত হয়, যখন তাহার প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে আমরা প্রায়শই দেখি, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার পদে পদে বিঘ্নিত হইতেছে। অথচ সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া খুবই সামান্য। তাহারা কে ক্ষমতায় আছেন বা আসিবেন, তাহা লইয়া অধিকাংশ সময় তেমন মাথা ঘামান না। তাহাদের মূল চিন্তা হইল জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা ও জানমালের নিরাপত্তা বিধান। একই সঙ্গে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ ও চলাফেরার অধিকার চাহেন তাহারা। তাহারা চাহেন লিবারটি বা ব্যক্তি স্বাধীনতার বাস্তবায়ন। কারণ, ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা করা না গেলে কোনো নাগরিকই নিজেকে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসাবে ভাবিতে পারেন না।
gnews দৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন
এইসব দেশের তৃণমূল পর্যায়ের নাগরিকগণ সংবিধান, সংস্কার বা অর্থনৈতিক রিজার্ভ ইত্যাদি তেমন বুঝেন না। তাহারা ইহা লইয়া ততটা চিন্তিত নহেন, যতটা চিন্তিত নিজেদের অধিকার রক্ষা এবং হয়রানি ও বিড়ম্বনামুক্ত জীবন যাপনের ব্যাপারে। যদি কোনো রাষ্ট্রে নাগরিকদের এই মৌলিক স্বাধীনতাগুলো সুরক্ষিত না হয়, তাহলে যতই পরিবর্তন আনয়নের কথা বলা হউক না কেন, তাহার কোনো মূল্য নাই। বিশেষত লিবারটি বা ব্যক্তিস্বাধীনতার গুরুত্ব সর্বাধিক। একজন নাগরিকের নিজ ইচ্ছানুসারে জীবনধারণের অধিকার রহিয়াছে, যেইখানে রাষ্ট্র বা অন্য কোনো ব্যক্তি তাহার উপর অন্যায়ভাবে কোনো বাধা বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করিবে না। এই স্বাধীনতা নাগরিককে নিজের পছন্দ, বিশ্বাস ও কর্ম নির্ধারণের সুযোগ দেয়, যাহা একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি। এইজন্য জন স্টুয়ার্ট মিল বলিয়াছেন, ‘ব্যক্তির উপর রাষ্ট্র বা সমাজের হস্তক্ষেপ কেবল তখনই ন্যায়সংগত, যখন সেই ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করিতেছে।’ অর্থাৎ, অপরের ক্ষতি না করিয়া একজন ব্যক্তি তাহার নিজের জীবন স্বাধীনভাবে পরিচালনা করিতে পারিবে, ইহাই হইল লিবারটি। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে দেখা যায়, একজন নিরীহ মানুষও গ্রেফতার হইতেছেন। বিনা বিচারে কারাগারে কাটাইতেছেন বৎসরের পর বৎসর। গণমামলার শিকার হইয়া কত মানুষ যে গৃহছাড়া-লক্ষ্মীছাড়া হইয়াছেন, বা মামলা পরিচালনা করিতে গিয়া পথের ভিখারিতে পরিণত হইয়াছেন, তাহার কোনো ইয়ত্তা নাই।
একটি রাষ্ট্রে ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা করা হইলে নাগরিকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি ইহা তাহাদের সৃজনশীলতার বিকাশ ও সমাজের অগ্রগতিতে সহায়ক হয়। এইজন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (Freedom of Expression) তথা নিজ মতামত ও বিশ্বাস প্রকাশ করিবার অধিকার, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা (Freedom of Religion) তথা নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার, ভয় ও দারিদ্র্য হইতে স্বাধীনতা (Freedom from Fear and Want) তথা যুদ্ধবিগ্রহ, সংঘাত ও অভাব অনটন হইতে মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে হইবে। ইহাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক স্বাধীনতা হইল চলাফেরার স্বাধীনতা (Freedom of Movement)। অর্থাৎ একজন নাগরিক দেশের অভ্যন্তরে যে কোনো স্থানে অবাধে চলাচল, বসবাস, এবং দেশ ত্যাগ ও দেশে ফিরিয়া আসিবার অধিকার রাখেন। এই স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম, কারণ ইহা ব্যক্তিকে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক সুযোগ অন্বেষণে সহায়তা করে। এই স্বাধীনতা না থাকিলে মানুষের জীবনযাত্রা সীমিত হইয়া পড়ে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয় এবং সমাজ স্থবির হইয়া যায়। মোটকথা, কোনো নাগরিককে ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা রাজনৈতিক মতামতের ভিত্তিতে চলাচলে বাধা দেওয়া উচিত নহে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব হইল জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু কোনোভাবেই তাহাদের চলাফেরার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা নহে।
যদি কোনো রাষ্ট্র নাগরিকদের অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করিতে না পারে, তবে সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হইয়া যায়। জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হ্রাস পায়। এই জন্য অব্রাহাম লিংকন বলেন, ‘Those who deny freedom to others deserve it not for themselves.’ অর্থাৎ যাহারা অন্যের স্বাধীনতা হরণ করে, তাহারা নিজেদেরও স্বাধীনতা লাভের যোগ্য নহে। অতএব, রাষ্ট্রের সকল স্তরের কর্তৃপক্ষের উচিত নাগরিকদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। সর্বোপরি, নাগরিক হিসাবে আমাদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হইতে হইবে এবং যে কোনো অন্যায় বাধা-প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হইতে হইবে। কেননা মনে রাখিতে হইবে, অধিকার এমনিতেই আসে না, তাহা আদায় করিয়া লইতে হয়।