• ১লা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ , ২০শে শাবান, ১৪৪৫ হিজরি

রোজিনা জামিন পাবেন ?

Daily Jugabheri
প্রকাশিত মে ২১, ২০২১
রোজিনা জামিন পাবেন ?

যুগভেরী ডেস্ক :::
অফিসিয়াল সিক্রেটস আইনে গ্রেপ্তার প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলাম জামিন পাবেন কি না, সেই সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে রোববার পর্যন্ত।
ঢাকার মহানগর হাকিম বাকী বিল্লা বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল কোর্টে দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদেশ অপেক্ষমান রাখেন। পরে জানানো হয়, আদেশ দেওয়া হবে রোববার।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু অবশ্য বলছেন, রোববার আরও শুনানি হবে, তারপর আদেশ।
ব্যক্তিগত কারণে আবদুল্লাহ আবু এদিন নিজে শুনানিতে ছিলেন না। রোজিনার জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হেমায়েত উদ্দিন খান হিরন।
তিনি বলেন, “আসামির কাছ থেকে আলামত উদ্ধার করা হয়েছে, তাকে জামিন দেওয়া ঠিক হবে না।”
অন্যদিকে রোজিনার আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, “এজাহারে সেরকম কোনো আলামতের বর্ণনা নেই। যে আলামতের কথা বলা হচ্ছে, তা পরে ম্যানিপুলেট করা।”
রোজিনার পক্ষে শুনানিতে আরও ছিলেন আইনজীবী আশরাফ উল আলম, প্রশান্ত কর্মকার ও আমিনুল গণী টিটো।
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ব্লাস্টের মশিউর রহমান এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মো. আবদুর রশীদও উপস্থিত ছিলেন।
রোজিনা ইসলামের স্বামী মনিরুল ইসলাম ও পরিবারের সদস্যরা, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হকসহ কয়েকজন সহকর্মীও এসেছিলেন আদালতে।
তবে ভার্চুয়াল শুনানি হওয়ায় রোজিনাকে আদালতে আনা হয়নি। তাকে রাখা হয়েছে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে।
গ্রেপ্তারের পরদিন মঙ্গলবার পুলিশ রোজিনাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করলে আদালত তা খারিজ করে দেয়।
সেদিন জামিনের আবেদন করা হলে আদালত বিষয়টি রোববার শুনানির জন্য রাখে। এখন বিষয়টি রোববার আদেশের জন্য রাখা হল।
কী ঘটেছিল
রাষ্ট্রীয় গোপন নথি ‘চুরির চেষ্টার’ অভিযোগে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে সোমবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের এক কর্মকর্তার কক্ষে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়।
পরে রাতে তাকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করে ব্রিটিশ আমলের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ও দণ্ডিবিধির কয়েকটি ধারায় মামলা করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।
রোজিনা ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আর তার সহকর্মীরা বলেছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘অনিয়ম-দুর্নীতি’ নিয়ে প্রতিবেদন করায় তাকে ‘হয়রানি’ করা হচ্ছে ব্রিটিশ আমলের এক আইন ব্যবহার করে।
সচিবালয়ে আটকে রাখার সময় রোজিনাকে ‘শারীরিকভাবে হেনস্তা’ করা হয় বলেও অভিযোগ করেছে তার পরিবার। তার স্বামী মনিরুল ইসলাম বলেছেন, তিনি ‘পাল্টা মামলা’ করার কথা ভাবছেন।
শুনানিতে যা হল
ভার্চুয়াল এই শুনানিতে আসামির উপস্থিতি ছিল না। বিচারক ছিলেন তার খাস কামরায়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর কার্যালয়ে বসে এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বিচারকের এজলাসে ছিলেন। সবাই ভার্চুয়াল আদালতে যুক্ত হয়েছিলেন জুমের মাধ্যমে।
রোজিনার আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের এ আইনে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার সবই জামিনযোগ্য।
“আর দণ্ডবিধির অভিযোগ আমার (মক্কেলের) বিরুদ্ধে আসে না। তিনি গুপ্তচরবৃত্তি (স্পায়িং) অথবা রাষ্ট্রের পরিপন্থি কোনো কাজ করেননি। এজাহারে চুরির কথা বলা হলেও কী কী ডকুমেন্টস তিনি চুরি করে নিয়ে গেছেন তার বর্ণনা নেই। তার দখল থেকে কী উদ্ধার হয়েছে তার বর্ণনা নেই। সুতরাং মামলাটি আইনের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগ বানোয়াট, সৃজিত ও উদ্দেশ্যমূলক।”
আইনজীবী আশরাফ উল আলম বলেন, “চুরির ঘটনা ঘটলে ৫ ঘণ্টা আটকে রেখে মামলা করতে হত না। সঙ্গে সঙ্গেই করা যেত। আর উপমহাদেশে সাংবাদিকেদের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে আমার জানা মতে কোনো মামলা হয়নি। হয়েছে পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের কূটনীতিক মাধুরী গুপ্তার বিরুদ্ধে।
“পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাকে ডকুমেন্ট পাচারের অভিযোগে দিল্লির একটি আদালত ২০১৮ সালে সাজা দেয়। আর ভারতে একজন সাংবাদিক মি. সাইকিয়ার বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা হলে দিল্লি হাই কোর্ট অভিমত দেন, যে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এ আইনে মামলা চলবে না।”
আইনজীবী অমিনুল গণী টিটো বলেন, “শুধুমাত্র আশঙ্কা থেকে ‘অপরাধ সংঘটিত হয়েছে’ বলা যাবে না। ভ্যাকসিন কেনা নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত থাকতে পারে না। রোজিনা এর আগে লিখেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঠিকমতো অফিস করেন না, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ৩৫০ কোটি টাকার অনিয়ম নিয়েও তিনি প্রতিবদন লিখেছিলেন।
“তার বিরুদ্ধে আক্রোশের বশবর্তী হয়ে এ মামলা আনা হয়েছে। কথিত ঘটনার পাঁচ ঘণ্টা বিলম্বে মামলা কেন করা হল, তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা এজাহারে নেই। যদি কোনো ভিডিও বা ডকুমেন্ট আনা হয়, তবে তা ম্যানিপুলেট করা।”
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কার পেন্টাগন পেপারস মামলার উদাহরণ তুলে ধরে এ আইনজীবী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মামলাটি প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছিল।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ এর বিরোধিতা করে বলেন, “এ সাংবাদিক অপরাধ করেছেন। তিনি রাষ্ট্রীয় গোপন নথি চুরি করেছেন রাষ্ট্রের ভাবমূতি নষ্ট করার জন্য। এ চোরাই নথি প্রকাশ করা হলে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নষ্ট হত।
“ঘটনার অনেক ভিডিও ক্লিপ আমাদের হাতে রয়েছে, আমারা দাখিল করব। আমাদের হাতে অনেক প্রমাণ রয়েছে।”
শুনানির এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী রোজিনাকে ‘ঘসেটি বেগম’ আখ্যাখ্যায়িত করেন। বাংলার শেষ নবাব সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রকারী’ হিসাবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন ঘসেটি বেগম।
উপস্থিত সাংবাদিকরা রোজিনাকে ‘ঘসেটি বেগম’ বলার কারণ জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।
রোজিনার আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী তখন বলেন, “এ বিষয়টিতো নথিপত্রে নেই। এটি তার ব্যক্তিগত মত। কেউ বার্কিং করলে আমরা তো বার্কিং করতে পারি না, সে কামড় দিলে আমারও একই কাজ করতে পারি না। “
এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় শুনানির সময় নির্ধারণ করা হলেও সেই সময় এক পিছিয়ে দেওয়া হয়। বেলা ১১টায় সময় দেওয়া হলেও পরে আবার তা পিছিয়ে ১২টায় নেওয়া হয়।
এজলাসের ছোট পরিসরে আইনজীবী, সাংবাদিক, রোজিনার আত্মীয়-স্বজন, আদালত কর্মচারী, পুলিশ আর উৎসুক দর্শক মিলিয়ে শ খানেক লোক তখন উপস্থিত। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অনেকেই অধৈর্য্য হয়ে পড়েন।
সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট- সিপিজে এবং রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) রোজিনাকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
আর জাতিসংঘ এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, সাংবাদিকদের ‘হয়রানিমুক্তভাবে’ কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

রোজিনাকে কেন সেদিন দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হল, সেই ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে মন্ত্রী জাহিদ মালেক দুদিন আগে সাংবাদিকদের বলেন, রোজিনা টিকা আমদানি সংক্রান্ত এমন কিছু নথি ‘সরিয়েছিলেন’ যেগুলো প্রকাশ হলে ‘দেশের ক্ষতি’ হতে পারত।
আর তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘ভুল’ রোজিনারও থাকতে পারে, সাংবাদিকদের ‘আবেগপ্রবণ না হয়ে বাস্তবতার নিরিখে’ বিষয়টি দেখা উচিত।
তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মনে করেন, সেদিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘দায়িত্বশীলরা’ সাংবাদিকদের ‘ব্রিফ’ করলে হয়ত ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হত না।
আর রোজিনাকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে ‘দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।
তিনি বলেন, “শেখ হাসিনার সরকার হচ্ছে সংবাদপত্রবান্ধব সরকার। আমরা কখনো আপনাদের নিষেধ করি না। উই হ্যাভ নাথিং টু হাইড। যে ঘটনা ঘটছে, খুব দুঃখজনক ঘটনা।”

সংবাদটি শেয়ার করুন