• ২৬শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ১৮ই জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন : সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি

Daily Jugabheri
প্রকাশিত নভেম্বর ৩০, ২০২১
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন : সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি

বিন্দু তালুকদার, সুনামগঞ্জ
তৃতীয় দফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রবিবার সুনামগঞ্জ জেলার সুনামগঞ্জ সদর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার ১৭ টি ইউনিয়নে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চেয়ারম্যান পদে সুনামগঞ্জ সদর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার ১৭ টি ইউনিয়নের ফলাফলে চরমভাবে ভরাডুবি হয়েছে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের।
১৭ টি ইউনিয়নের মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সকল প্রার্থীই পরাজিত হয়েছেন। কেবল শান্তিগঞ্জের দুইটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। অন্য ১৫ টিতেই নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীরা। ১৭ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে কেবল শান্তিগঞ্জ উপজেলায় পশ্চিমপাগলা ইউনিয়নে জগলুল হায়দার ও একই উপজেলার পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নে রিয়াজুল ইসলাম নৌকা প্রতীকে বিজয়ী হয়েছেন।
প্রার্থী বাছাইয়ের ত্যাগী ও যোগ্য প্রার্থী না দেওয়া, দলের নেতাকর্মীদের বিভক্তি ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের পরাজয় হয়েছে বলে মন্তব্য দলের নেতা-কর্মীদের।
বিএনপি প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ না নিলেও তাদের দলের ৫ জন প্রার্থী স্বতন্ত্র প্রতীকে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁরা হলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা কৃষক দলের সদস্য সচিব আব্দুল ওয়দুদ (আনারস), মোল্লাপাড়া ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মো. নুরুল হক (মোটরসাইকেল), রঙ্গারচর ইউনিয়নে বিএনপি নেতা মো. আব্দুল হাই (মোটরসাইকেল), শান্তিগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশায় ইউনিয়নে বিএনপির সুফি মিয়া (চশমা) ও একই উপজেলার পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নে বিএনপি নেতা লুৎফর রহমান জায়গীরদার খোকন (চশমা) চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা কৃষক দলের সদস্য সচিব আব্দুল ওয়াদুদ (আনারস)। এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ছিলেন মো. মিজানুর রহমান (নৌকা)।
মোহনপুর ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সদর উপজেলা কৃষক লীগের আহ্বায়ক মো. মঈন উল হক (মোটরসাইকেল), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগ নেতা সিতেশ তালুকদার মঞ্জু (নৌকা)।
মোল্লাপাড়া ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মো. নুরুল হক (মোটরসাইকেল), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মনির উদ্দিন (নৌকা)।
রঙ্গারচর ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি নেতা বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হাই (মোটরসাইকেল), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল মজিদ (নৌকা)।
কাঠইর ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন জমিয়তের উলাময়ে দলের প্রার্থী শামসুল ইসলাম (খেজুর গাছ), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা অ্যাড. বুরহান উদ্দিন (নৌকা)।
কোরবাননগর ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন বতর্মান চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আবুল বরকত (মোটরসাইকেল), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন সামছু উদ্দিন (নৌকা)।
গৌরারং ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী (লাঙ্গল) মো. শওকত আলী, এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, জেলা কৃষক লীগের সদস্য ছালমা আক্তার চৌধুরী (নৌকা)।
জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী রশিদ আহম্মেদ (লাঙ্গল), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মুকসেদ আলী (নৌকা)।
সুরমা ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আমির হোসেন রেজা (চশমা), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুস ছাত্তার ডিলার (নৌকা)।
এদিকে শান্তিগঞ্জ উপজেলা সদরের জয়কলস ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল বাছিত সুজন (ঘোড়া), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ মিয়া (নৌকা)।
পাথারিয়া ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শহীদুল ইসলাম (ঘোড়া), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, সামছুল ইসলাম রাজা (নৌকা)।
পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জগলুল হায়দার (নৌকা) ও পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছে, আওয়ামী লীগ (নৌকা) মনোনীত প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম।
শিমুলবাঁক ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগের সমর্থক শাহীনুর রহমান (আনারস), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান জিতু মিয়া (নৌকা)।
পূর্ব পাগলা ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাসুক মিয়া (আনারস), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, রাশিকুল ইসলাম (নৌকা)।
দরগাপাশায় ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি নেতা সুফি মিয়া (চশমা), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান মনির উদ্দিন (নৌকা)।
পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি নেতা লুৎফুর রহমান জায়গীরদার খোকন (চশমা), এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন, আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাড. দেবাংশু শেখর দাস (নৌকা)।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের আহমেদ অপু বলেন,‘ আওয়ামী লীগের সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে কাজ করলে অবশ্যই নৌকার বিজয় নিশ্চিত হতো। কিন্তু দলীয় কোন্দলের কারণে আওয়ামী লীগের প্রায় সকল প্রার্থীর পরাজয় হয়েছে। এসব বিষয়ে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে হস্তক্ষেপ করতে হবে।’
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা উপজেলা যুব লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট বুরহান উদ্দিন দোলন বললেন,‘ তৃণমূলের পছন্দের ও যোগ্য প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ায় ইউনিয়ন কমিটির নেতাকর্মীরা নৌকার পক্ষে সক্রিয় ছিল না। অনেক ইউনিয়নের স্থানীয় নেতাকর্মীরা পছন্দের ও তাদের সুপারিশকৃত প্রার্থী না পেয়ে গোপনে দলের বিরোধিতা করেছেন। যার কারণে দল ক্ষমতায় থাকার পরও নৌকার শোচনীয় পরাজয় হয়েছে।’
শান্তিগঞ্জ উপজেলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বলেন,‘ দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যোগত্যা সম্পন্ন ও জনপ্রিয় না হওয়ায় অনেক প্রার্থী নৌকা প্রতীক পাওয়ার পরও জয়ী হতে পারেন নি। অনেক প্রার্থীকেই সাধারণ ভোটাররা ভালভাবে গ্রহণ করেননি। প্রার্থী বাছাই ও তৃণমূল পর্যায়ে দল গোছাতে কেন্দ্র থেকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।’
দলীয় প্রার্থীদের পরাজয়ের বিষয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হেকিম বলেন,‘ নানা কারণে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। এরমধ্যে দলের নেতাকর্মীদের বিভাজন, নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বি, প্রার্থী বাছাইয়ের ঐক্যমতে না পৌঁছানোর বিষয়গুলো রয়েছে। ’ দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূল পর্যায়ে আরও সমন্বয় ও সম্মিলিতভাবে একক প্রার্থী বাছাই করতে পারলে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হত না এবং এসব বিষয় নিয়ে দলের উচ্চ পর্যায়ে গুরত্বসহকারে ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম বললেন, ‘সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় দীর্ঘদিন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন বিএনপির। চার মেয়াদ হয়েছে সদরে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যও নেই। এই অবস্থায় সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। তৃণমূল সমর্থকরাও দলের প্রতি কিছুটা বিমূখ। আওয়ামী লীগের নতুন কর্মীও তৈরি হচ্ছে না। এসব বিষয় কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদেরও অবহিত করা হয়েছে। নির্বাচনে এ কারণে দলীয় প্রার্থীদের পরাজয় হয়েছে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন