• ১৮ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ১২ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

শিক্ষার মানোন্নয়নই আমার স্বপ্ন: শান্তিগঞ্জের ইউএনও

Daily Jugabheri
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১, ২০২২
শিক্ষার মানোন্নয়নই আমার স্বপ্ন: শান্তিগঞ্জের ইউএনও

হাওর বেষ্টিত জেলা সুনামগঞ্জ। এ জেলার অধিকাংশ উপজেলা দেশের অন্যান্য উপজেলার তুলনায় শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে। নানা প্রতিকূলতাই কারণ। তন্মধ্যে শান্তিগঞ্জ উপজেলা একটি। যদিও উচ্চ শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত করতে খুব জোরেশোরে চলমান আছে একাধিক উচ্চ শিক্ষা অর্জনের প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ কাজ। তদুপরি এ উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষামান নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। উপজেলার অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক স্কুলের ৪র্থ, ৫ম ও মাধ্যমিক স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির প্রায় শিক্ষার্থীরা রিডিং পড়তে পারেন-না। স্কুলে আসার প্রতিও তাদের রয়েছে অনীহা। এছাড়া আশঙ্কাজনক হারে শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ছেন।

এর কারণ অনুসন্ধান ও এসব ক্ষেত্রে উন্নতির লক্ষ্যে কাজ করছেন শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার উজ্ জামান। এ জন্য সুনামগঞ্জ জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ইউএনও মনোনীত হয়েছেন।

প্রান্তিক এলাকার পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে তার ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন সিলেটটুডের সাথে। সিলেটটুডের শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি ইয়াকুব শাহরিয়ার সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন।

কেনো মনে হলো প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করা দরকার?

৩রা মে ২০২১ সালে এ উপজেলায় আসার পর থেকে বিভিন্ন স্কুল ভিজিট করি। এসময় লক্ষ্য করি উপজেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা রিডিং পড়তে পারে না। এটা দুঃখজনক। ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী যদি বাংলা রিডিং পড়তে না পারে তাকে আপনি টেন্স, পেসেজ, বীজগণিত ইত্যাদি কী পড়াবেন? আর এমনটাই হচ্ছে আমাদের উপজেলায়। এজন্য মনে হয়েছে শিক্ষার্থীদের ফাউন্ডেশনটা একটু মজবুত হওয়া জরুরি। প্রাথমিকের একজন শিক্ষার্থী যখন বাংলা, ইংরেজি বিষয় রিডিং পড়া না শিখে মাধ্যমিকে যাবে তখন তার কাছ থেকে কী আশা করা যায়? মাধ্যমিকের স্যারদের সিলেবাসে তো আর বর্ণ পরিচয় শেখানোর সময়ই নাই। এজন্য প্রাথমিকের দিকে প্রথমে নজর দেওয়া।

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যাচ্ছেন, অতিরিক্ত সময় দিচ্ছেন, কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

বেশ সাড়া পাচ্ছি, রেজাল্টও ভালো হচ্ছে। কয়েকটি প্রাথমিক স্কুলকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এসেছি। প্রথমদিকে স্কুলগুলো অগোছালো ছিলো, এখন বেশ গোছালো। আমাদের বিশেষ নজরদারিতে প্রাথমিক স্কুলগুলো। আমরা চাই প্রতিটি স্কুল স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার রোল মডেল হোক। শিক্ষকরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব গুরুত্ব সহকারে পালন করেন। তারা তাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হলে আমরা আরও বেশি ভালো ফলাফল পাবো। বন্যার পরে আমরা কাজ করে উপজেলাব্যাপী যে সাড়া পেয়েছি তা আরো ভালো হবে; যদি শিক্ষকরা আন্তরিক হন।

শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে পাঠক্রমের বাইরে আর কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন?

নৈতিক শিক্ষার ওপরে খুব বেশি জোর দিয়েছি। ইদানিং অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা ৭ম, ৮ম শ্রেণিতে উঠলেই বখে যায়। মা-বাবা, শিক্ষক, বয়োজ্যেষ্ঠদের কথা মানতে চায় না। তাই তাদেরকে নৈতিক শিক্ষা দানের লক্ষে প্রত্যেক স্কুলের শিক্ষকদেরকে সপ্তাহে একদিন এ ক্লাসের দিকে জোর দিতে নির্দেশ দিয়েছি। আমি নিজে নজর রাখছি। একগাদা কাগজ দেখিয়ে তিনি বলেন, এই যে কাগজগুলো দেখছেন এরকম ৯৭টি ফাইল আমার কাছে আছে। প্রতিটি স্কুলের প্রতি ক্লাসের শিক্ষার্থীদের মাসিক প্রতিবেদন এগুলো। কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে দুর্বল তা চিহ্নিত করা আছে এখানে। এই তালিকা দেখে দেখে তাদের দুর্বল বিষয়ের প্রতি আলাদা করে যত্ন নেওয়া হবে। এখানে একটা স্কুলের তালিকা আছে আমার হাতে যাদের ৪র্থ শ্রেণির ২৭ জন শিক্ষার্থী ইংরেজি রিডিং পড়তে পারে না এবং ৫ম শ্রেণির ১২ জন। বাংলা রিডিং পড়তে পারে না এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়। এসব দেখাশোনা করার জন্য ১২ জন কর্মকর্তাকে ট্যাগ করে দিয়েছি। তারা ট্যাগ অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারক আহমদ ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রভাষক নূর হোসেনও সরাসরি এ বিষয়ে কাজ করছেন। তাদের দু’জনকে বিশেষ ধন্যবাদ। অনেক ইউনিয়নের অনেক চেয়ারম্যানকেও আমরা দিকনির্দেশনা দিয়েছি, তারাও কাজ করছেন। মূলত: উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের লোকদের সমন্বয়ে আমরা একটি টিমওয়ার্ক করছি।

এ বিষয়ে শিক্ষকদের সাথে সাথে কথা বলেছেন?

বলেছি। মাসিক সমন্বয় সভায় যতজন প্রধান শিক্ষক আসেন তাদের সাথে প্রতিবারই কথা বলি। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জটাই এখন আমার বড় স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব শিক্ষকের আন্তরিকতায় আশা করছি আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো। আমাদের লক্ষই হচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিখিয়ে দেওয়া। অন্ততপক্ষে রিডিং পড়তে পারা শিখাতে হবে। যখন একজন শিক্ষার্থী অনর্গল পড়তে পারবে তখনই শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ বাড়বে। তা না হলে সে ঝড়ে পড়বে। এজন্য শিক্ষকদের পরিশ্রম করতে হবে। আগামী ডিসেম্বরে আমরা একটি শিক্ষক সম্মেলনের চিন্তা করছি। সেখানে ১০জন শিক্ষককে সম্মানিত ও সেরার ঘোষণা দেওয়া হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রী মহোদয়কে এখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত রাখার চেষ্টা করবো আমরা। পরিশ্রমের বিষয়টি আমরা শিক্ষকদের উপর ছাপিয়ে দিচ্ছি না। আমরা চাই সম্মানিত শিক্ষকরা যথাসময়ে নিজ কর্মস্থলে আসুন, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক হোন আর নিজ দায়িত্বটুকু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করুন। যাদের সার্বিক ফলাফল ভালো না তাদের আমরা বিশেষ ভাবে দেখছি। পাগলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ দু’চারটি স্কুল আমাদের বিশেষ নজরদারিতে আছে।

সবকিছুর জন্য কতটুকু আশাবাদী?

আশি শতভাগ আশাবাদী আমরা সফল হবো। কাজ করতে হবে। শিক্ষার উন্নয়নে আমার উপজেলার জন্য অনেক কাজ করার ইচ্ছা আছে। কাজ করছি। আরো কাজ করতে চাই। সকলের দোয়া ও সহযোগিতা প্রত্যাশি।

সিলেটটুডেকে ধন্যবাদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন