• ৩রা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ , ২২শে শাবান, ১৪৪৫ হিজরি

কুশিয়ারা তীর রক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ

Daily Jugabheri
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৭, ২০২৩
কুশিয়ারা তীর রক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব সংবাদদাতা, হবিগঞ্জ
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতায় জেলার কুশিয়ারা নদীর তীর প্রতিরক্ষা প্রকল্প নির্মাণ কাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ এই মেগা প্রকল্পের ৫৭৩ কোটি টাকার কাজ নিয়ে ভানুমতীর খেলা চলছে। আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহল। তারা বলছে কুশিয়ারা প্রকল্প কাজে ইতোমধ্যে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হচ্ছে, নিম্নমানের মালামাল ব্যবহারের ফলে কাজ শেষ হওয়ার পূর্বেই ৫৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন নদীর তীর প্রতিরক্ষা প্রকল্পের বেশকিছু স্থান দেবে ফাটল দেখা দিয়েছে । পানি উন্নয়ন বোর্ডের যোগসাজশেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতি করছে। এদিকে প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মামলার ভয়ে অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে মুখ খুলছে না এলাকাবাসী।
তবে ব্লক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ ও ব্লক দেবে যাওয়ার বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পাউবো।
জানা যায়, হবিগঞ্জের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ “কুশিয়ারা ডাইক” প্রতি বছর বর্ষায় ভেঙে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ, সিলেটের ওসমানী নগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামসহ ভাটি ও হওরাঞ্চলের বাড়িঘর ও কয়েক হাজার হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে যায় পানির নীচে। নদীর উভয় তীরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবী ছিল বর্তমান প্রযুক্তিতে নতুন ভাবে কুশিয়ারা উভয়পাশে বাঁধ নির্মাণের জন্য।
প্রতি বছরে এমন বিধ্বংসী ভাঙন রোধে ও অকাল বন্যা থেকে রক্ষা পেতে জাতীয় সংসদে কুশিয়ারা উভয় তীর রক্ষায় জিও ব্যাগ ও ব্লক দিয়ে প্রতিরক্ষা প্রকল্প নির্মাণের জোর দাবী জানান হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজ। সংসদ সদস্যের দেয়া বক্তব্য দৃষ্টিগোচর হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কুশিয়ারা নদীর উভয় তীর রক্ষায় প্রায় সাড়ে ৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রতিরক্ষা প্রকল্প নির্মাণে ৫৭৩ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকের সভায় অনুমোদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দরপত্র আহবানের কাজ পায় ৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, সে গুলো হল, গোলাম রব্বানী কনস্ট্রাকশন, এএইচ ট্রেডিং কোং, আরএফএল, নেশন ট্রেক কমিশন ও আবুল কালাম কোং। তারা ১১টি প্যাকেজে কাজ শুরু করেন। ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় হবিগঞ্জ জেলার বিবিয়ানা বিদ্যুৎ কেন্দ্রসমূহের সম্মুখে কুশিয়ারা নদীর উভয় তীরের প্রতিরক্ষা প্রকল্পের কাজ।
এর মধ্যে এ এই্চ ট্রেডিং কোং, আরএফএল ও নেশন ট্রেক কমিশনের কাজে ফাটল দেখা দিয়েছে। আরএফএল এ পরিচালক রাসেল আহমদ জানান, তাদের কাজের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়নি সবার কাজেই ফাটল দেখা দিয়ে নীচে দিয়ে দেবে গেছে। তারা সবাই কাজের সংশোধন করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যান্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে ফোন ধরেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকে কুশিয়ারা নদীর তীর প্রতিরক্ষায় ব্লক নির্মাণে মাটি যুক্ত বালু, নুরি পাথর, ছোট পাথরের জায়গায় বড় পাথর, গোটা পাথর, মরা পাথর ও পাথরের সাথে ধুলোবালিযুক্ত অবস্থায় ঢালাই, ইটের খোয়া মিশ্রণ, অধিকাংশস্থানে সিমেন্টের তুলনায় অতিরিক্ত বালি ব্যবহারসহ নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে বাধ নির্মাণ করে আসছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। তদারকির দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই এমন অনিয়ম হয়ে আসছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নবীগঞ্জের পাহাড়পুর অংশে এ এইচ ট্রেডিং কর্পোরেশন নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা বাধ নির্মাণ করছেন। সেখানে গুণগত মানের সিমেন্ট ব্যবহার করা হলেও সিমেন্টের তুলনায় মরা পাথর, অতিরিক্ত বালি ব্যবহার করতে দেখা যায়। এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা আরাফাত খান কথা বলতে রাজি হননি।
এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশন টেক ট্রেডিং, আরএফএল ট্রেডিং করপোরেশন নিম্নমানের মালামাল দিয়ে বাধ নির্মাণের ফলে লামা তাজপুর এলাকার খোয়াজ উল্লাহ, জিলু মিয়া ও বাছিত মিয়ার বাড়ির সামনেসহ বেশ কিছু স্থানে কুশিয়ারা প্রতিরক্ষা প্রকল্পের বাধ দেবে গেছে। প্রকল্প কাজে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
শেরপুর এলাকার জুয়েল আহমদ বলেন- বন্যা নিয়ন্ত্রণে প্রতিরক্ষা প্রকল্প নির্মাণ ছিল সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ কিন্তু নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করার ফলে প্রতিরক্ষা প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পূর্বেই বাধ দেবে যাচ্ছে।
তাজপুর এলাকার তফুর আলী জানান- নিম্নমানের বালি ও মরা পাথর দিয়ে শুরু থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ নির্মাণ করে আসছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা আসেন সবকিছুই দেখেন কিন্তু কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও অফিসাররা মিলেমিশেই দুর্নীতি করে আসতেছে তাই এলাকার মানুষ মামলার ভয়ে প্রতিবাদ করে না।
লামা তাজপুরের খোয়াজ উল্লাহ বাধ নির্মাণে অনিয়মের কথা জানিয়ে বলেন, প্রতিবাদ কে করবে, কোথায় করবে কেনই বা করবে, ৫শ-৬শ কোটি টাকার প্রকল্প আমরা প্রতিবাদ করলে অল্পকিছু টাকা খরচ করলেই আমাদের মামলা দিয়ে হয়রানী করবে। এছাড়া অফিসাররা সবকিছু জানেন কিন্তু চুপ হয়ে আছেন, কেন আছেন সেটা তো আপনারাও বুঝছেন।
ওই এলাকার জিলু মিয়া বলেন, নিম্নমানের পাথর বাধ তৈরি করা হচ্ছে। কাজে বালু-পাথর ও সিমেন্ট মিশ্রণের সঠিক অনুপাত মানা হচ্ছে না।
নবীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল হক চৌধুরী সেলিম বলেন, বাধ নির্মাণে অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে ত্বরিতগতি কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবী জানাই।
হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজ মিলাদ বলেন, এত কষ্ট করে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় প্রকল্প নিয়ে আসলাম, কিন্তু বাধ নির্মাণে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হউক।
এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ বলেন, কুশিয়ারা নদীর উভয় তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ ১১টি প্যাকেজের মাধ্যমে কাজ চলমান রয়েছে। এ কাজগুলো মূলত নদী ভাঙনরোধে করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন