• ১৫ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৩১শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ৯ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

বিশ্ব ইজতেমা ও আখেরি মুনাজাত

Daily Jugabheri
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৭, ২০২৩
বিশ্ব ইজতেমা ও আখেরি মুনাজাত

সম্পাদকীয় : বিশ্ব মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্ব ইজতেমা দুই বৎসর অনুষ্ঠিত হয় নাই। তাই এবার তুলনামূলকভাবে অধিক মুসল্লির ঢল নামিয়াছে টঙ্গীর ময়দানে। এই ইজতেমার জন্য এত দিন তাহারা উন্মুখ হইয়াছিলেন। রোববার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। ইহাতেও হাজার হাজার সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মিছিল ছুটে ইজতেমা প্রাঙ্গণে। ইহাতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হইতে হাজার হাজার বিদেশি মেহমানও ইহাতে শরিক হইয়াছেন। তাহাদের সম্মিলিত ও মুহুর্মুহু ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনিতে মুখরিত হইয়া উঠে চারিদিক।
মানবজাতির হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তায়ালা এই পৃথিবীতে অসংখ্য নবি-রসুল পাঠাইয়াছেন। যেইহেতু হজরত মুহাম্মদ (স.) আখেরি নবি, তাই ইসলামের দাওয়াতের কাজটি এখন উম্মতে মুহাম্মদির উপর ন্যস্ত। আল্লাহ তায়ালা এই ব্যাপারে বলিয়াছেন, ‘তাহার চাইতে উত্তম কথা কাহার, যিনি মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন, নেক আমল করেন এবং বলেন আমি মুসলিম বা আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী। (সুরা হা-মিম সিজদাহ, আয়াত-৩৩)। এই উপমহাদেশে দাওয়াতে ইসলামের একটি বড় প্রতিষ্ঠান তাবলিগ জামাত। তাবলিগ অর্থ প্রচার করা। আর এসব প্রচারকারীর জমায়েত বা মহাসম্মেলনের নামই বিশ্ব ইজতেমা। এই বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও এইভাবে বড় আকারে হয় না। বিভিন্ন দেশে তাবলিগ জামাতের লোকজন যে সমাবেশ করেন, তাহা সেই দেশের বার্ষিক ইজতেমা হিসাবে পরিচিত; কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হইতে সেখানে এত মানুষের সমাগম হয় না। বলা হয়, কাবাশরিফে হজব্রত পালনের পর ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সর্ববৃহৎ জমায়েত হয় এই বিশ্ব ইজতেমায়। এই দিক দিয়া বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। তবে এখানে এই কথা বলা আবশ্যক যে, মক্কাশরিফের হজব্রত পালনের সহিত বিশ্ব ইজতেমাকে তুলনা করা যাইবে না কিছুতেই। কেননা হজব্রত পালন করা ফরজ। আর বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করাটা বরকতময় হইলেও ইহা কোনো ফরজ বা অত্যাবশ্যকীয় আমল নহে।
ইহা অনস্বীকার্য যে, তাবলিগ জামাতের ধর্মপ্রচারের পদ্ধতি অনেকটাই আদি, অকৃত্রিম ও অনন্য। নিয়তের দিক হইতেও তাহাদের মধ্যে রহিয়াছে একনিষ্ঠতা। তাহারা এই জন্য কোনো বিনিময় প্রত্যাশা করেন না। বিশ্ব ইজতেমার মতো এত বড় আয়োজনে স্বেচ্ছাশ্রমই তাহাদের মূল ভরসা। বিশ্ব ইজতেমার মূল কর্মসূচির মধ্যে রহিয়াছে—আমবয়ান, ছয় উসুলের (কলেমা, নামাজ, এলেম ও জিকির, একরামুল মুসলিমিন, সহি নিয়ত ও তাবলিগ) হাকিকত, বিদেশে নূতন জামাত পাঠানো, তাশকিল, দারসে কোরআন, নূতন চিল্লা তৈরি ও যৌতুকবিহীন বিবাহ। ১৩৫১ হিজরিতে হজরত ইলিয়াস (রহ.) ভারতের মেওয়াত অঞ্চলে তাবলিগ জামাতের সূচনা করেন, যাহা হরিয়ানা ও রাজস্থান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৪৪ সালে হজরত মাওলানা আবদুল আজীজ (রহ.)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে তাবলিগের মেহনত শুরু হয়। ইহার দুই বৎসর পর ১৯৪৬ সালে তাবলিগ জামাতের প্রাণকেন্দ্র ঢাকার কাকরাইল মসজিদে শুরু হয় বিশ্ব ইজতেমার পথচলা। তবে বৃহত্ পরিসরে টঙ্গিতে বিশ্ব ইজতেমা শুরু হয় ১৯৬৫ সালে। অর্থাৎ বিশ্ব ইজতেমা আজ একটি ইসলামি ঐতিহ্য তৈরি করিয়াছে। বিশেষ করিয়া সাধারণ মুসলমানগণ ইহার সুশীতল ছায়ায় আসিয়া দিনি এলেম ও আমলের মাধ্যমে তাহাদের ইমান-আখলাকে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়ন করিতেছেন। আর বিশ্ব ইজতেমার কারণে সমগ্র বিশ্বে গড়িয়া উঠিতেছে বাংলাদেশের এক ইতিবাচক ভাবমূর্তি।
রোববার আখেরি মোনাজাত এক আবেগঘন ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি হয়, তাহাও অতুলনীয়। আল্লাহ আমাদের দোয়া ও আহাজারি কবুল করুন। সমগ্র বিশ্বে আনয়ন করুন শান্তি-শৃঙ্খলা, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা। আমিন।

সংবাদটি শেয়ার করুন